
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর এবার পার্লামেন্টের সদস্য (এমপি) পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির সাবেক নেতা কিয়ার স্টারমার। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে লন্ডনের হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস আসনের এমপি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে স্টারমারের ১১ বছরের সংসদীয় ক্যারিয়ারেরও অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তবে পার্লামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালেও রাজনীতি ও জনজীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিকল্পনা নেই তাঁর। বরং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
‘দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সঠিক সময়’
ফেসবুকে দেওয়া বিবৃতিতে স্টারমার বলেন, গ্রীষ্মকালজুড়ে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছেন। সেই ভাবনাচিন্তার পর তাঁর কাছে এখন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সঠিক সময় বলে মনে হয়েছে।
হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস আসনের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগকে তিনি দীর্ঘ ১১ বছরের জন্য ‘সম্মান ও সৌভাগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্টারমারের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ছিল এই আসন। ২০১৫ সালে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি আসনটির প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা হওয়ার পরও এটি ছিল তাঁর সংসদীয় ঘাঁটি।
এখন এমপি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্তের ফলে তাঁর সেই দীর্ঘ সংসদীয় অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটছে।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মনোযোগ দেবেন
পার্লামেন্ট ছাড়লেও জনজীবনে নিজের ভূমিকা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্টারমার। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মতো বিষয়ে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর সহিংসতা মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে যে কাজ করে আসছেন, সেটিও অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন লেবার সরকারের প্রতিও পূর্ণ সমর্থন থাকবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন স্টারমার।
তাঁর এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দলীয় রাজনীতির সরাসরি নেতৃত্ব থেকে সরে গেলেও আন্তর্জাতিক ও নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি সক্রিয় থাকতে পারেন।
আইনজীবী থেকে পার্লামেন্টে
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে কিয়ার স্টারমারের পেশাগত পরিচয় ছিল আইনজীবী। ব্যারিস্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ডিরেক্টর অব পাবলিক প্রসিকিউশনস (ডিপিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আইন ও বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের এমপি ফ্রাঙ্ক ডবসনের উত্তরসূরি হিসেবে হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস আসন থেকে প্রথমবার পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।
এরপর ধীরে ধীরে লেবার পার্টির জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী হয়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর দলের নেতৃত্বের দৌড়েও এগিয়ে আসেন তিনি।
২০২০ সালে লেবার নেতৃত্বে
২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর দলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল জেরেমি করবিনের উত্তরসূরি হিসেবে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন স্টারমার।
দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি লেবারকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটিকে মধ্যপন্থী ও নির্বাচনীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন তিনি।
চার বছরের মধ্যে সেই প্রচেষ্টার বড় সাফল্য আসে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় জয়
২০২৪ সালের ৪ জুলাই অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পায়। দলটি ৪০০টির বেশি আসনে জয়লাভ করে এবং এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে টানা ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটে।
নির্বাচনের ফল স্টারমারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচনের পরদিন, ৫ জুলাই তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে লেবার পার্টি দীর্ঘ বিরতির পর আবার সরকার গঠনের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে স্টারমারও বিরোধী দলের নেতা থেকে দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্বে চলে আসেন।
প্রধানমন্ত্রিত্বে অর্থনীতি ও সরকারি সেবায় জোর
নিজের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্টারমার ২০১৯ সালের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর লেবার পার্টিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে ২০২৪ সালে বড় জয় এনে দেওয়ার বিষয়টিকে তাঁর অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিশু দারিদ্র্য কমানোর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার কথা তিনি তুলে ধরেছেন।
তাঁর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে থাকা বিভিন্ন সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে সমালোচনাও ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক চাপ, জনসমর্থনের ওঠানামা এবং দলের ভেতরের বিভিন্ন মতপার্থক্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে স্টারমারকে।
স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে ধাক্কা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে লেবার পার্টির ফলাফল নিয়ে নতুন করে চাপের মুখে পড়েন স্টারমার।
দলের অভ্যন্তরেও তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ও চাপ বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে দলীয় প্রক্রিয়া শেষে অ্যান্ডি বার্নহাম লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হন। এরপর গত ২০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়েন স্টারমার।
প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর এবার এমপি পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন তিনি।
১১ বছরের সংসদীয় জীবনের অবসান
স্টারমারের এমপি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ২০১৫ সালে শুরু হওয়া তাঁর সংসদীয় জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। একজন ব্যারিস্টার থেকে এমপি, এরপর লেবার পার্টির নেতা এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী—এক দশকের কিছু বেশি সময়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০১৯ সালের নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর লেবারকে পুনর্গঠন করে ২০২৪ সালে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের দুই বছরের মাথায় দলীয় ও নির্বাচনী চাপের মুখে পদত্যাগ করতে হয় তাঁকে।
এখন পার্লামেন্টের সরাসরি রাজনীতি থেকেও সরে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন স্টারমার।
তাঁর বিদায়ী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ১১ বছরের একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মতো বিষয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা কেমন হবে, সেদিকেও নজর থাকবে।