
এনসিপির মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানকে ‘বিরোধী দল দমনের চক্রান্ত’ এবং ‘ফ্যাসিবাদী পথের পুনরাবৃত্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তাঁরা দাবি করেছেন, বর্তমান দুদকের কোনো নৈতিক ও আইনি বৈধতা নেই।
বুধবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা এ মন্তব্য করেন। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য অতীতে যেভাবে দুদককে ব্যবহার করা হয়েছে, বর্তমান কমিশনকে ঘিরেও সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন বলেছেন, শুধু জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান দুদক পুনর্গঠন করা হলেই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব। অন্যথায় এ ধরনের অনুসন্ধানকে তাঁরা ‘লোকদেখানো’ কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এর আগে বুধবার দুপুরে দুদকের এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর কথা জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলা হলেও পরে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন বলে এনসিপির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এনসিপির
‘দুদককে পুনরায় বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার করার অপচেষ্টা এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ’ শীর্ষক যৌথ বিবৃতিতে নাহিদ ও আখতার বর্তমান দুদকের গঠনপ্রক্রিয়া ও কার্যক্রম নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন।
তাঁদের দাবি, গত সাত মাসে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কাজ হাসিল এবং জনগণের অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদক কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
এনসিপির দুই নেতা বলেন, একদিকে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগে দুদকের নীরবতা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একজন বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের বৈপরীত্য কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তাঁরা আরও দাবি করেন, দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের কথিত ‘নীরবতা’ প্রমাণ করে যে বর্তমান দুদক শুরু থেকেই অসাংবিধানিকতা ও স্বচ্ছতাহীনতার প্রশ্নে বিতর্কিত। এ কারণে কমিশনটির নৈতিক ও আইনি বৈধতা নিয়েও তাঁরা আপত্তি জানিয়েছেন।
‘প্রাথমিক সত্যতা’ নিয়ে বক্তব্য পরিবর্তনের অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দুদকের বক্তব্যের অসঙ্গতিকেও বিবৃতিতে গুরুত্ব দিয়েছে এনসিপি।
নাহিদ ও আখতার দাবি করেন, অনুসন্ধান শুরুর বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে দুদকের মুখপাত্র প্রথমে ‘দুর্নীতির সত্যতা’ বা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সাংবাদিকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিয়ে ওই কর্মকর্তা ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন।
এনসিপির দুই নেতা এ ঘটনাকে দুদকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার জন্য গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই যদি কোনো কমিশন অভিযোগের বিষয়ে এমন পরস্পরবিরোধী তথ্য দেয়, তাহলে সেই কমিশনের অধীনে পরিচালিত তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
তাঁদের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে একটি তথ্য প্রকাশ করার পর গোপনে তা সংশোধনের চেষ্টা দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
‘বিরোধী দল দমনের পুরোনো কৌশল’
বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব আরও বলেন, দেশের বিরোধী দলগুলো যখন জনগণের মৌলিক অধিকার আদায় এবং গণরায় অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় হচ্ছে, তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে দুদককে ব্যবহারের পুরোনো কৌশল আবারও সামনে এসেছে।
তাঁদের ভাষ্য, নিজেদের অপকর্ম আড়াল করা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করার যে প্রবণতা অতীতে দেখা গেছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান সেই প্রবণতারই পুনরাবৃত্তি।
নাহিদ ও আখতার এটিকে ‘পরাজিত ফ্যাসিবাদের আমলের পুরোনো ও নিপীড়নমূলক কায়দার বিপজ্জনক পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তাঁরা আরও দাবি করেন, ফ্যাসিবাদী আমলে যে আইনি কাঠামোর অধীনে দুদক গঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল, বর্তমান কমিশনও একই আইনের অধীনে গঠিত হয়েছে। ফলে কমিশনের কাঠামোগত স্বাধীনতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে।
‘ড্রেস রিহার্সেল’ বলেও মন্তব্য
এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নবগঠিত দুদককে ব্যবহার করে বিরোধী দল দমনের ‘ড্রেস রিহার্সেল’ আবারও সামনে এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
তাঁদের অভিযোগ, অতীতে দুদককে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে অভিযোগ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কা আবারও তৈরি হয়েছে।
তবে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানটি বর্তমানে তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি। এনসিপি মূলত অনুসন্ধান শুরুর প্রক্রিয়া এবং দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি জানিয়েছে।
বর্তমান দুদক বাতিলের দাবি
বর্তমান দুদককে ‘অসাংবিধানিক ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায়’ গঠিত দাবি করে কমিশনটি অবিলম্বে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন।
তাঁদের দাবি, জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যোগ্য, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। তাঁদের মতে, দুর্নীতি দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য কমিশনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা অপরিহার্য।
এনসিপির দুই নেতা বলেন, দুদককে কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর বিরুদ্ধেও সমানভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁরা সরকারের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি দুদককে ‘বিরোধী দল দমন কমিশনে’ পরিণত করার যেকোনো প্রচেষ্টা বন্ধ করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী পথ’ থেকে ফেরার আহ্বান
বিবৃতির শেষ দিকে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন সরকারকে অবিলম্বে কথিত ‘ফ্যাসিবাদী পথ’ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
তাঁদের বক্তব্য, দুদকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন কিংবা ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তাঁরা কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে এনসিপির এই প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দলটি বর্তমান দুদকের কাঠামো ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে দলটির দুই শীর্ষ নেতা দাবি করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য একটি নতুন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।