
পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি কলকাতা হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য বিশেষভাবে তালিকাভুক্ত করার আবেদনও আদালত গ্রহণ করেননি। ফলে এই মুহূর্তে মামলায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের কোনো ধরনের অন্তর্বর্তী স্বস্তি মেলেনি।
বুধবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শুনানির জন্য তোলেন সাংবাদিকদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এন মুখোপাধ্যায়। তিনি মামলায় অবিলম্বে আদালতের হস্তক্ষেপ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি প্রক্রিয়া থেকে স্বস্তি দেওয়ার আবেদন জানান।
তবে আদালত জানান, বিষয়টি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় এগোবে। এ মুহূর্তে মামলাটিকে আলাদা করে বিশেষ শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হবে না।
‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শব্দ ব্যবহার ঘিরে মামলা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রসংগঠন ফেটসুর শিক্ষার্থীদের মধ্যে গত আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২১ আগস্ট। অভিযোগকারী সংগঠনের দাবি, ওই শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক সংগঠনের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক অনুভূতি উসকে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগে পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদকসহ সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়।
গেরুয়া রংকে ভারতে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতীকী রং হিসেবে দেখা হয়। ওই শব্দবন্ধ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়। এরপরই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলার কথা সামনে আসে।
জরুরি শুনানির আবেদন
বুধবার আদালতে সাংবাদিকদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এন মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শব্দ দুটি প্রকাশের পর সাংবাদিকদের একাধিক ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে আদালতে নেওয়ার জন্য তিনি আবেদন জানান।
আইনজীবী বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক অনুভূতি উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একাধিক ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পরিস্থিতির কারণে তাঁদের জরুরি আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।
তিনি আদালতে বলেন, ‘অভিযোগ করা হয়েছে, আমি অর্থাৎ সাংবাদিকেরা সাম্প্রদায়িক উসকানি দিচ্ছি। তিনটি ঘটনা ঘটেছে। আমার জরুরি স্বস্তি প্রয়োজন।’
মামলা বাতিলের আবেদন করার পরামর্শ
শুনানির একপর্যায়ে আদালত জানান, শুধু অন্তর্বর্তী স্বস্তি চাওয়ার পরিবর্তে মামলাটি বাতিলের জন্য আবেদন করাই উপযুক্ত পথ হতে পারে।
এর জবাবে এস এন মুখোপাধ্যায় জানান, তিনি মামলা বাতিলের আবেদনই করছেন।
তবে আদালত স্পষ্ট করে দেন, বিষয়টি স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোবে। মামলাটি নিয়ম অনুযায়ী আদালতের সামনে আসবে এবং তখন তা বিবেচনা করা হবে।
আইনজীবী এরপর মামলাটি দ্রুত তালিকাভুক্ত করার জন্য আবারও আবেদন করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় অবিলম্বে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
‘আলাদা করে সময় দেওয়া যাবে না’
জবাবে আদালত জানান, এ ধরনের একাধিক এফআইআর বাতিলের আবেদন ইতিমধ্যে তাঁর বেঞ্চে বিচারাধীন রয়েছে। ফলে নতুন করে একটি মামলাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে শুনানির জন্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
আদালত বলেন, ‘আমি এখন কোনো নতুন বিষয় আলাদা করে নির্ধারণ করছি না। কারণ, আমার কাছে অনেক এফআইআর বাতিলের আবেদন বিচারাধীন রয়েছে।’
আদালত আরও বলেন, এই মামলার জন্য আলাদা করে সময় দেওয়া হবে না। মামলাটি সাধারণ নিয়মেই আদালতের তালিকায় উঠবে। পরে প্রয়োজন হলে আইনজীবী বিষয়টি আদালতের নজরে আনতে পারবেন।
বিচারপতি বলেন, ‘এ মামলার জন্য আলাদা করে সময় দেওয়া যাবে না। এটি সাধারণ নিয়মেই উত্থাপিত হবে। খুব বেশি মামলা নেই, ফলে এটিকে বিবেচনা করা হবে। না হলে আপনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। আমি এখন আবেদন মঞ্জুর করছি না।’
পরিস্থিতি বদলালে ফের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ
আদালতের এই অবস্থানের পর এস এন মুখোপাধ্যায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বিষয়টি আবার আদালতের নজরে আনার অনুমতি চান।
জবাবে আদালত জানান, প্রথমে সংশ্লিষ্ট আবেদন যথাযথভাবে জমা দিতে হবে। এরপর সেটি শুনানির তালিকায় আনার চেষ্টা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, বুধবারের শুনানিতে সাংবাদিকদের আবেদনের বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। মামলাটিও বিশেষভাবে দ্রুত শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়নি।
আনন্দবাজার ভবনের সামনে বিক্ষোভ
এদিকে মঙ্গলবার কলকাতায় আনন্দবাজার পত্রিকা ভবনের সামনে একদল বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিক্ষোভের সময় আনন্দবাজার পত্রিকা ভবনের প্রবেশপথের কয়েকটি থাম গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পত্রিকাটিকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়।
তবে বুধবার আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের প্রথম পাতায় বিক্ষোভের ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেনি। বিষয়টি ভেতরের পাতায় সাধারণ সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
এখনো পাল্টা মামলা করেনি পত্রিকাটি
বিক্ষোভ, হুমকি এবং ভবনের কয়েকটি থাম গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার ঘটনার পরও আনন্দবাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শব্দবন্ধ ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের শুনানিতে আদালত তাৎক্ষণিক কোনো স্বস্তি না দেওয়ায় এখন মামলাটি নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোনোর অপেক্ষায় রয়েছে।