
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের আলোচিত ও সমালোচিত ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করতে জাতীয় সংসদে সংশোধনী বিল আনা হয়েছে। এই ধারায় এমন একটি সুযোগ রাখা হয়েছিল, যার মাধ্যমে কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে ওই ব্যাংকের শেয়ারধারকরা পরবর্তী সময়ে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারতেন।
ব্যাংক খাতের সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের আবারও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই ধারাটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। বিশেষ করে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুরোনো পরিচালকদের ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
এখন সেই বিতর্কিত ধারাটিই আইন থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
যে সুযোগ তৈরি করেছিল ১৮(ক) ধারা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান আইনের এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে ওই ব্যাংকের যাঁরা শেয়ারধারক ছিলেন, তাঁরা পরবর্তী সময়ে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
শুধু আগের শেয়ারধারকরাই নন, বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও একই ধরনের সুযোগ দিতে পারে।
ফলে সংকটে পড়া কোনো ব্যাংককে রেজোল্যুশনের আওতায় এনে পুনর্গঠন করার পর আগের মালিক বা শেয়ারধারকদেরই আবার সেই ব্যাংকের মালিকানা বা সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
ব্যাংক খাতের সংস্কার ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই বিধানই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ কোনো ব্যাংককে সংকটাপন্ন অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে আগের মালিক বা পরিচালকদের ভূমিকা থাকলে তাঁদেরই আবার ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে—এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
আগের অধ্যাদেশে ছিল না ১৮(ক)
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের এই বিধানটি শুরু থেকেই আইনে ছিল না।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সেই অধ্যাদেশে ১৮(ক) ধারা ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশটি সংশোধন করে অনুমোদন করা হয় এবং তখনই এই ধারাটি যুক্ত করা হয়।
ধারাটি যুক্ত হওয়ার পর থেকেই এর উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর পুরোনো মালিক ও পরিচালকদের ভবিষ্যতে আবার ব্যাংকিং ব্যবসায় ফেরার সুযোগ তৈরি হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
পরবর্তী সময়ে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগের সঙ্গে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে।
ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক।
এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলোর পুরোনো মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যেই ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা পুরোনো শেয়ারধারকদের পরবর্তী সময়ে আবার ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এই বিধান কার্যকর থাকলে সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালক বা শেয়ারধারকেরা কোনো এক পর্যায়ে আবার ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে পুরোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফিরে আসার পথ তৈরি হতে পারে—এমন প্রশ্নও ওঠে।
ব্যাপক সমালোচনার পর ধারা বাদ দেওয়ার উদ্যোগ
১৮(ক) ধারা নিয়ে সমালোচনা বাড়ার পর সরকার সেটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্যই এখন সংসদে সংশোধনী বিল আনা হয়েছে।
বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর উক্ত ধারার পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে ইতিমধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বিলুপ্ত করা সমীচীন।
অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে ধারাটি বাতিলের অন্যতম যুক্তি হলো—আইন কার্যকর হওয়ার পর এই ধারার অধীনে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। ফলে এমন একটি বিধান বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে সরকার মনে করছে।
তবে ধারাটি নিয়ে এর আগে যে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটিই এর বিলুপ্তির উদ্যোগের পেছনে বড় প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রেজোল্যুশন আইনের উদ্দেশ্য কী
ব্যাংক রেজোল্যুশন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো ব্যাংক গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে আমানতকারী ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠন, পুনরুদ্ধার বা প্রয়োজনীয়ভাবে সমাধান করা।
এ ধরনের ব্যবস্থায় সংকটাপন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা, মালিকানা, সম্পদ ও দায় নিয়ে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
তাই রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার পর আগের মালিক বা পরিচালকদের আবার ব্যাংকের সম্পদ ও শেয়ারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকলে পুরো প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই ১৮(ক) ধারার মতো বিধান ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
সংসদীয় কমিটিতে যাবে সংশোধনী বিল
বৃহস্পতিবার সংসদে উত্থাপনের পর ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিলটি অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে।
এরপর সংসদে বিলটির পরবর্তী ধাপের আলোচনা হবে। কমিটির সুপারিশ এবং সংসদের অনুমোদনের পর ১৮(ক) ধারা আইনি কাঠামো থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এতে সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারকদের পরবর্তী সময়ে আবার ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের যে বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটি আর থাকবে না।
বেসরকারি বিল নিয়ে নাজিবুর রহমানের সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ
এদিকে একই অধিবেশনে সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইনের সংশোধনী আনতে একটি বেসরকারি বিল সংসদে উত্থাপনের চেষ্টা করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
তিনি বিলটি সংসদে উত্থাপনের অনুমতি চাইলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে বক্তব্য দেন এবং বিলটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।
তবে নাজিবুর রহমান তাঁর বিল প্রত্যাহারে রাজি হননি।
এরপর বিষয়টি সংসদে ভোটে দেওয়া হয়। ভোটে ‘না’ পক্ষ জয়ী হয়। ফলে নাজিবুর রহমান তাঁর বেসরকারি বিল সংসদে উত্থাপনের অনুমতি পাননি।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে নজর জবাবদিহির দিকে
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হলো, যখন দেশের ব্যাংক খাতে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
একদিকে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করে আমানতকারী ও আর্থিক খাতের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের পুরোনো মালিক ও পরিচালকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এই বাস্তবতায় সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারকদের আবারও একই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের সুযোগ রাখার বিধান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
এখন সেই সুযোগ তৈরির পথ বন্ধ করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদে বিলটি পাস হলে ১৮(ক) ধারা আর থাকবে না।
ফলে ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরোনো শেয়ারধারকদের জন্য ওই বিশেষ প্রত্যাবর্তনের সুযোগও বিলুপ্ত হবে। ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় এটি মালিকানা ও জবাবদিহির কাঠামো আরও স্পষ্ট করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।