
ইন্দোনেশিয়ায় স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচির খাবার খেয়ে তিন দিনে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অসুস্থ হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনায় মধ্য জাভা প্রদেশের লাসেম এলাকার একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭৫২ শিক্ষার্থী ও ২৫ শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ তথ্য জানিয়েছেন। খাবার খাওয়ার পর আক্রান্তদের বেশির ভাগের ডায়রিয়া ও বমি শুরু হয়। তাঁদের খাবারের তালিকায় গ্রিল করা মুরগির মাংস ছিল।
এ নিয়ে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচিকে ঘিরে একাধিক খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় কর্মসূচির খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
লাসেমে অসুস্থ ৭৭৭ জন
মধ্য জাভার লাসেম এলাকার বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জুহারতুতিক জানান, বুধবার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে অসুস্থতার ঘটনা ঘটে। মোট ৭৫২ শিক্ষার্থী ও ২৫ শিক্ষক খাবার খাওয়ার পর ডায়রিয়া ও বমিতে আক্রান্ত হন।
খাবার বিতরণের আগেই মুরগির মাংস নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি নজরে এসেছিল বলে জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক বলেন, খাবার বিতরণের আগে একজন খাবার পরীক্ষক মুরগির কিছু অংশ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেন। সন্দেহজনক ওই অংশগুলো আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
তবে এর পরও খাবার খাওয়ার পর ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন।
জুহারতুতিক আরও জানান, রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি তাঁকে জানিয়েছেন, মুরগির মাংস রাত প্রায় তিনটার দিকে রান্না করা হয়েছিল। পরে দুপুরে তা শিক্ষার্থীদের পরিবেশন করা হয়।
অসুস্থদের বেশির ভাগকেই প্রাথমিক চিকিৎসার পর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ১৫ শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসক জোকো পারিয়ান্তো।
কয়েক দিনের ব্যবধানে আরও শত শত আক্রান্ত
লাসেমের ঘটনার আগে মঙ্গলবার পূর্ব জাভার সিদোয়ারজোতে একই কর্মসূচির খাবার খেয়ে ৬৬৪ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রান্নাঘরটি বুধবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এর পর বুধবার পূর্ব জাভার নগানজুক শহরে আরও ৪৯ জন এবং পশ্চিম সুমাত্রার আগাম এলাকায় ২৩৭ জন খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন।
অর্থাৎ, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই কর্মসূচির খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বড় আকার ধারণ করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের বরাতে দেশটির পার্লামেন্টের সদস্য চার্লস হনোরিস এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি সরকারের বাইরে থাকা দেশটির একমাত্র রাজনৈতিক দলের সদস্য।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে চার্লস বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। তাঁর ভাষায়, ‘এটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা।’
চার্লসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় এই কর্মসূচির খাবার খেয়ে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনায় মোট প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।
কয়েক শ কোটি ডলারের কর্মসূচি
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো গত বছর স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচি চালু করেন। দেশটির কোটি কোটি শিশুর পুষ্টির মান উন্নত করা এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বিশাল এই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ২৯৪ কোটি ডলার। এর তদারকির দায়িত্বে রয়েছে দেশটির জাতীয় পুষ্টি সংস্থা।
কর্মসূচিটির লক্ষ্য ছিল শিশুদের পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা দেওয়া এবং বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের পুষ্টিগত ঘাটতি কমানো। তবে শুরু থেকেই এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
কর্মসূচিকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং একের পর এক খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
খাবার সংরক্ষণ ও বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন
দেশটিতে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনাগুলোর কারণ হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা এবং রান্না করা খাবার দেরিতে পৌঁছানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
লাসেমের সর্বশেষ ঘটনাতেও খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের মধ্যবর্তী সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, মুরগির মাংস ভোররাতে রান্না করা হয়েছিল এবং তা দুপুরে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়।
এর মধ্যে খাবারের একটি অংশ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি খাবার পরীক্ষকের নজরে আসায় খাদ্যের মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
তবে ঠিক কোন কারণে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা অসুস্থ হয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তদন্ত ও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
জাতীয় পুষ্টি সংস্থার ওপর চাপ
বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচির বিশাল পরিসর এবং সাম্প্রতিক একের পর এক অসুস্থতার ঘটনায় কর্মসূচিটির তদারকির দায়িত্বে থাকা জাতীয় পুষ্টি সংস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে।
সংস্থাটির প্রধান সুদারিয়োনো পার্লামেন্টের এক শুনানিতে বলেছেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্য খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহ করা হয়। ফলে খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, রান্নার পর দ্রুত বিতরণ এবং খাবার পরীক্ষার মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জনগণের সন্তুষ্টিও কমছে
খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা কর্মসূচিটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাতেও প্রভাব ফেলছে।
জুলাই মাসে সাইফুল মুজানি রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিংয়ের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচি নিয়ে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সন্তুষ্ট।
জরিপে মানুষের অসন্তুষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, কর্মসূচিটি শিশুদের পুষ্টির উন্নয়নে বড় একটি সরকারি উদ্যোগ হিসেবে চালু হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুষ্টির লক্ষ্য বনাম নিরাপদ খাবারের চ্যালেঞ্জ
ইন্দোনেশিয়া সরকারের জন্য কর্মসূচিটির মূল লক্ষ্য শিশুদের পুষ্টির উন্নতি করা। কিন্তু খাবার খেয়ে ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অসুস্থ হওয়ার ঘটনা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশেষ করে রান্নাঘরের ব্যবস্থাপনা, খাবার সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণের সময় এবং খাদ্যের মান পরীক্ষা—প্রতিটি ধাপে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বড় পরিসরের এই কর্মসূচিতে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
লাসেমের ৭৭৭ জনের অসুস্থতা, সিদোয়ারজোর ৬৬৪ জন, নগানজুকের ৪৯ জন এবং পশ্চিম সুমাত্রার ২৩৭ জন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা সেই ঝুঁকিরই বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
একদিকে শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সরকারের বহু বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ, অন্যদিকে সেই খাবার খেয়ে হাজার হাজার মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়া—এই দ্বৈত বাস্তবতা এখন ইন্দোনেশিয়ার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মসূচিটি কার্যকর রাখতে হলে শুধু বিনা মূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়াই নয়, খাবার নিরাপদ ও মানসম্মত কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর সেই ব্যবস্থাপনাকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।