
‘আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে রাস্তায় হেঁটেছে, এই সরকারও সেই রাস্তায় হাঁটছে’
গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়ে লংমার্চের প্রথম পর্ব শেষ করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। শনিবার চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত সমাপনী সমাবেশ থেকে জোটের নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা, ওয়াদা লঙ্ঘন ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও একই পথে এগোচ্ছে। এখনই সরকারকে সতর্ক না হলে এর পরিণতিও আগের আওয়ামী লীগ সরকারের মতো হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।
শনিবার সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে সমাবেশের মাধ্যমে এ লংমার্চ কর্মসূচির প্রথম পর্ব শুরু হয়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি পথসভা করেন ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা। এসব পথসভায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। পরে রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চের প্রথম পর্ব শেষ হয়। রাত সাড়ে নয়টার দিকে কর্মসূচি শেষ হয়।
ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ
১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চের মূল দাবি ছয়টি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
জোটের নেতারা বলছেন, এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন থামবে না। লংমার্চকে তাঁরা সরকার পতনের তাৎক্ষণিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখালেও ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে আন্দোলনের ধরন আরও কঠোর হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ছাড়াও দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান (মঞ্জু), লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান) এবং জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধানসহ জোটের নেতারা অংশ নেন।
‘এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়’
সমাপনী সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, লংমার্চের ডাক দেওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে তাঁদের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট সময় বা উৎসবকে কেন্দ্র করে নয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন।’
ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হলে সেটির সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে বলে জানান জামায়াতের আমির।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি’
শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এর রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছিল। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাবে, তরুণেরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি দূর হবে।
তবে তাঁর অভিযোগ, এসব প্রত্যাশার কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ বুক কেটে আশায় বুক বেঁধেছিল যে এবার একটা পরিবর্তন আসবে। সন্তানেরা ভালো শিক্ষা পাবে, তারপর হাতে ভালো কাজ পাবে। তারা দেশ গড়বে। দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূল হবে। তার একটাও হয়নি।’
‘আগের সরকার যে রাস্তায় হেঁটেছে, এই সরকারও সেই রাস্তায়’
চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ও সিটি করপোরেশনের প্রসঙ্গ তুলে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, আগের সরকার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে। চট্টগ্রামকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বর্তমান মেয়রকে ঘিরে আলোচনার সমালোচনা করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি কত দিন দায়িত্বে থাকবেন, তা অনির্দিষ্ট হতে পারে না। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি আসেন, আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। আপনি নেতৃত্ব দেন। আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে অনির্দিষ্টকাল কাউকে দায়িত্বে রাখার বিষয়টি সুশাসন নাকি ফ্যাসিবাদ—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
‘নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করাই সবচেয়ে বড় গুপ্ত’
সমাবেশে বক্তব্যের একপর্যায়ে ‘গুপ্ত’ প্রসঙ্গেও কথা বলেন জামায়াতের আমির। তিনি সরকারি দলের লোকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চুরি ও ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন।
সম্প্রতি ঢাকায় বিমানবন্দরে এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান দাবি করেন, ছিনতাইয়ের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। পরে আটক হওয়ার পর তাদের বিএনপির লোক বলে দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর তিনি বলেন, ‘একেই বলে গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে, সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুপ্ত।’
তাঁর এ বক্তব্য একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ‘গুপ্ত’ প্রসঙ্গের বক্তব্যের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় আসে। যদিও শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করেননি।
‘নতুন কোনো স্বৈরাচারের রাস্তা হতে দেব না’
সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, তাঁরা পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন এবং দেশে সেই স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে নতুন কোনো স্বৈরাচার যেন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফেরত আসতে পারবে না। একইভাবে নতুন কোনো স্বৈরাচার হওয়ার রাস্তাও আমরা এই বাংলাদেশে হতে দেব না।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা এখনো সংসদের অধিবেশনে রয়েছেন, তবে পরবর্তী অধিবেশনে যাবেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। কারণ জনগণের অধিকার ও সমস্যার সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, তাহলে সেই সংসদ কোনো কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদ-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে।’ এর আগেই সরকারকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া অথবা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পরিচালনার পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।
‘গণভোটের রায় কার্যকর না হলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, লংমার্চের উদ্দেশ্য সরকার পতন নয়; বরং সরকারকে সতর্ক করা এবং জনগণের দাবির বিষয়ে সরকারকে সচেতন করা।
তবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মামুনুল হক বলেন, গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে তাঁদের সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন একসময় সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
তিনি বিএনপিরও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচন আদায় করা এবং গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে দলটি যথেষ্ট আন্তরিক ছিল না।
মামুনুল হক দাবি করেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। জনগণের এই রায় উপেক্ষা করা হলে আবারও মানুষ রাজপথে নামবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় উপেক্ষা করার পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল—এমন ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বর্তমান জনগণের রায় নিয়েও তামাশা করা হলে আবার রাজপথে আন্দোলন গড়ে উঠবে।
‘বর্তমান সরকারের সঙ্গে বাকশালি সরকারের পার্থক্য নেই’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বক্তব্যে তিনিও বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেন।
অলি আহমদ দাবি করেন, বর্তমান সরকারের সঙ্গে অতীতের বাকশালি সরকারের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের গণতন্ত্র ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
অলি আহমদ বলেন, দেশের মানুষ শান্তিতে নেই। সন্তানদের নিরাপত্তা এবং চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে মানুষ পরিবর্তন চায় বলে দাবি করেন তিনি।
অর্থনীতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা
সমাবেশে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অলি আহমদ। দেশে অর্থের সংকট রয়েছে এবং প্রতিদিন নতুন নোট ছাপানো হচ্ছে—এমন দাবি করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতি কীভাবে এগিয়ে যাবে।
ক্ষমতায় আসার আগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে পরে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন এলডিপির সভাপতি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ নিরাপত্তা ও সুশাসন চায়। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের পরিবর্তনের লক্ষ্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা
চট্টগ্রামের সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চের প্রথম পর্ব শেষ হলেও আন্দোলন এখানেই শেষ হচ্ছে না—নেতাদের বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে এসেছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবি পূরণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জোটের নেতারা।
ফলে চট্টগ্রামের লংমার্চকে কেন্দ্র করে ১১–দলীয় রাজনৈতিক জোটের রাজপথের কর্মসূচির প্রথম ধাপ শেষ হলেও সামনে তাদের আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি কী হয়, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের নজর।