
ইরানের তেলবাহী তিনটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর এই পাল্টা হামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার ইরান একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালায়। তবে মার্কিন বাহিনী হামলাগুলো এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি বলে দাবি করেছে সেন্টকম।
এরপর আঞ্চলিক জলসীমায় থাকা ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ওমান উপসাগর ও ইরানের খারগ দ্বীপের কাছে থাকা ট্যাংকারগুলো এই হামলার শিকার হয়।
তিন ট্যাংকারের মধ্যে দুটি অচল, একটি ধ্বংস
সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার অচল হয়ে গেছে এবং তৃতীয় একটি ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, আক্রান্ত জাহাজগুলো শুধু সাধারণ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল না; বরং এগুলো আইআরজিসি ও তাদের ‘আঞ্চলিক মিত্রদের’ অর্থায়নে পরিচালিত কয়েক শ কোটি ডলারের একটি নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।
তবে হামলার পর ট্যাংকারগুলোর অবস্থা, সেখানে থাকা নাবিকদের পরিস্থিতি কিংবা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি সেন্টকম।
ফলে হামলায় জাহাজগুলোর কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বেসামরিক নাবিকেরা কোনো ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
‘আমাদের জাহাজে হামলা হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়াব’
ইরানের তেলবাহী জাহাজে হামলার বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।
তিনি বলেন, আইআরজিসির জন্য এই হামলার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—মার্কিন সামরিক বাহিনীর জাহাজে হামলা চালানো হলে তার জবাব আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মাধ্যমে দেওয়া হবে।
ব্র্যাড কুপারের ভাষ্য, “আপনারা যদি আমাদের দুটি জাহাজে হামলা করেন, তাহলে আপনাদের তিনটি জাহাজ ধ্বংস করে আমরা আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করব।”
তিনি আরও বলেন, মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধা করবে না। প্রয়োজন হলে ইরানের ছোট ও অরক্ষিত তেল পরিবহনের নৌবহর ধ্বংস করার হুমকিও দেন তিনি।
তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর মধ্যেই নিজেদের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখছে না; ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করছে।
আগে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
সেন্টকমের বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর পাল্টা হামলার সূত্রপাত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে।
শনিবার আঞ্চলিক জলসীমায় টহলরত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি এবং একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে আইআরজিসি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হননি।
এরপরই ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা অভিযান চালানো হয়।
এতে সংঘাতের সামরিক মাত্রার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মাত্রাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানের তেল পরিবহন অবকাঠামো ও সমুদ্রপথকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে দেশটির বৈদেশিক আয় এবং তেল রপ্তানির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হতে পারে।
খারগ দ্বীপের কাছে হামলা
মার্কিন বাহিনীর হামলার স্থানগুলোর মধ্যে ইরানের খারগ দ্বীপের আশপাশও রয়েছে। ইরানের তেল খাতের জন্য এই এলাকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা সংঘাতের অর্থনৈতিক দিককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
অন্যদিকে ওমান উপসাগরও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। এই অঞ্চলে সামরিক অভিযান বাড়তে থাকলে তেল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
এরই মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তেলবাহী ট্যাংকারকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে হামলার হুমকি ট্রাম্পের
ইরানের তেলবাহী তিনটি ট্যাংকারে মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে শিগগির হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।
এর মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প এর আগেও ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
চলমান সংঘাতের এই পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধকে তুলনামূলকভাবে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এর বাস্তব প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সামরিক হতাহতের পাশাপাশি জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
ছয় মাসের যুদ্ধে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাত্রাও কয়েক দফা বেড়েছে।
যুদ্ধের কারণে শুধু দুই দেশের সামরিক বাহিনীই ক্ষতির মুখে পড়ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও সংঘাতের প্রভাব অনুভব করছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথ, তেল পরিবহন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে ট্রাম্প সংঘাতের গুরুত্বকে তুলনামূলকভাবে কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ‘ছোটখাটো বিষয়’। কিন্তু ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে সাম্প্রতিক হামলা এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা সংঘাতের ঝুঁকি যে এখনো যথেষ্ট উচ্চ, তা তুলে ধরছে।
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর বাড়ছে সামরিক চাপ
এই যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশই একে অপরকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে যে আলোচনা চলছিল, তা এরই মধ্যে ভেস্তে গেছে।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর আঘাত হানছে, অন্যদিকে তেল পরিবহন ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে চাপ বাড়াচ্ছে।
ইরানও মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। সর্বশেষ মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
ফলে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা এখন শুধু নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি অবকাঠামো, তেল পরিবহন এবং সমুদ্রপথও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ, ফের শুরু হয়েছে হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে। এরপর প্রায় এক মাস দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি আবারও হামলা শুরু হয়েছে।
নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি একে অপরের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ইরানের তেলবাহী তিনটি ট্যাংকারে মার্কিন হামলা সেই সংঘাতকে আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ তেল পরিবহন ও রপ্তানি ইরানের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ খাতের ওপর আঘাত দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার মার্কিন কৌশলের অংশ হতে পারে।
অন্যদিকে ইরান যদি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও আঞ্চলিক স্বার্থের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও আরও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে বলে ব্র্যাড কুপারের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সংঘাতের পরবর্তী গতি নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তেহরানও মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
বিশেষ করে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সামরিক তৎপরতা বাড়ার ফলে সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কূটনৈতিক সমাধানের পথ কতটা দ্রুত পুনরায় খুলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এর মধ্যে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও আরও বাড়তে পারে।