
সদ্য পাস হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। দলটির অভিযোগ, গুমের ঘটনা তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো কাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি। বরং যেসব বাহিনী বা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছে, তাদেরই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল নিয়ে উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির মতে, এসব আইন আরও কার্যকর, স্বচ্ছ, মানবিক ও জনবান্ধব করার সুযোগ রয়েছে।
সোমবার পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দল দুটি এসব বক্তব্য জানায়। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন ও বিশেষায়িত ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার আইনে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
‘অভিযুক্তদের দিয়েই তদন্তের ব্যবস্থা’
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া এক বিবৃতিতে বলেন, রাষ্ট্র যখন কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত বা রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী বা সংস্থার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ওঠে, তখন সেই একই বাহিনী বা সংস্থার হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি অবিচার হবে।
তাঁদের অভিযোগ, গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কাঠামো গড়ে তোলার যে জাতীয় দাবি ছিল, পাস হওয়া বিলে সেটি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতারা বলেন, অভিযুক্ত বাহিনী বা সংস্থার সদস্যদের দিয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করানোর ব্যবস্থা প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে না। তাঁদের মতে, এতে গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং ভুক্তভোগী পরিবারও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আস্থার সংকটে পড়তে পারে।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় না এনে তাঁদের দিয়েই তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হলে তা গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধের পরিবর্তে দায়ীদের সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের দাবি
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন পাস হওয়া বিলের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি পুরোপুরি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত কমিশন গঠনের জন্য পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
দলটির নেতাদের মতে, তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রভাবমুক্ত রাখা না গেলে গুমের অভিযোগের প্রকৃত তদন্ত সম্ভব হবে না। তাই তদন্তকারী কাঠামোর স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরে তদন্ত চায় এবি পার্টি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়ে এবি পার্টিও স্বাধীন তদন্ত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, যেসব বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতে গুমের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের কোনোভাবেই গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্বে রাখা উচিত নয়।
তাঁরা গুমের ঘটনা তদন্তে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষায়িত একটি তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান। তাঁদের মতে, তদন্তের দায়িত্ব এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে দিতে হবে, যাদের ওপর অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব নেই।
নির্দেশদাতা ও সহযোগীদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি
এবি পার্টির নেতারা বলেন, গুমের ঘটনায় শুধু সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করলেই তদন্ত সম্পূর্ণ হবে না। এর সঙ্গে নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
তাঁদের মতে, গুমের মতো অপরাধ সাধারণত একক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তাই কোনো ঘটনার পেছনে কারা নির্দেশ দিয়েছেন, কারা পরিকল্পনা করেছেন, কারা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছেন—তদন্তে এসব বিষয়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান
গুমের অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকারও আইনে সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে এবি পার্টি।
দলটির নেতারা বলেন, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের অধিকার আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
তাঁদের মতে, গুমের ঘটনায় শুধু অপরাধের তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতের দাবি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে এবি পার্টি। দলটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের প্রভাবমুক্ত এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু ও আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারে কমিশনের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তদন্ত ক্ষমতা থাকতে হবে।
এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল, স্বাধীন বাজেট এবং অবাধ পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে দলটি।
বিশেষ করে সম্ভাব্য গোপন আটককেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন হেফাজতস্থলে পূর্বানুমতি ছাড়াই পরিদর্শনের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলেছে এবি পার্টি। তাদের মতে, মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি স্বাধীন কমিশনের কার্যকর প্রবেশাধিকার থাকা জরুরি।
সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল নিয়েও উদ্বেগ
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ছাড়াও সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে এবি পার্টি।
দলটির নেতারা বলেন, মা-বাবা বা কোনো দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করা হলেও তাঁদের ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করার উদ্দেশ্য মানবিক। তবে এ ধরনের বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে মুসলিম আইন বা শরিয়াহর সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিকতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এ জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরাম ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
দান, হেবা ও উত্তরাধিকার নিয়ে স্পষ্টতা চায় এবি পার্টি
সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিলের ক্ষেত্রে দান, হেবা, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলোর সঙ্গে নতুন বিধানের সামঞ্জস্য স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে এবি পার্টি।
দলটির নেতারা বলেন, নতুন কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আগের আইনগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক ও প্রয়োগের ক্ষেত্র পরিষ্কার না হলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পারিবারিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা নতুন বিরোধের জন্ম দিতে পারে।
তাঁদের মতে, বাবা-মায়ের সম্পত্তি ও আবাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে এমন কোনো আইন করা উচিত নয়, যার ফলে পরিবারে নতুন সম্পত্তি বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি মামলা-মোকদ্দমার সূত্রপাত ঘটে।
‘আইন হতে হবে মানবিক, স্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য’
এবি পার্টির চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আইনকে একই সঙ্গে মানবিক, স্পষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে।
তাঁদের মতে, মা-বাবার নিরাপত্তা ও ভোগাধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা যেমন বিবেচনা করতে হবে, তেমনি সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেও এর প্রয়োগে যেন নতুন বিরোধ বা অধিকারসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
তিনটি আইন নিয়ে আলোচনার দাবি
সোমবারের পৃথক বিবৃতিতে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মূলত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের তদন্ত কাঠামো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে এবি পার্টি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল—এই তিনটি বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
দল দুটির বক্তব্যে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকলেও গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উভয় পক্ষই গুরুত্ব দিয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন যেখানে পাস হওয়া বিলের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে, সেখানে এবি পার্টি গুমের তদন্তে অভিযুক্ত বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিশেষায়িত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি নির্দেশদাতা ও সহযোগীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছে।
একই সঙ্গে এবি পার্টি মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা জোরদার এবং সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত নতুন বিধানকে আরও স্পষ্ট ও জনবান্ধব করার দাবি জানিয়েছে। দলটির মতে, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মানবিক প্রয়োজন, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি এবং বিদ্যমান আইন ও ধর্মীয় বিধানের সামঞ্জস্য—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।