
দেশের যোগ্য ও সক্ষম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি ডিগ্রি চালুর সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে এ সুযোগ সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উন্মুক্ত হবে না। নির্ধারিত যোগ্যতা, গবেষণার সক্ষমতা ও একাডেমিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারবে—এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
গবেষণার মান, একাডেমিক সততা ও ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ।
মঙ্গলবার রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পরে ইউজিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিষয়গুলো জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও গবেষণার সক্ষমতা রয়েছে—এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে এ সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পিএইচডি একটি উচ্চতর গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তিতে এ ডিগ্রি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক ও গবেষক, প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামো, মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ এবং একাডেমিক সততা নিশ্চিত করার সক্ষমতা থাকতে হবে।
পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও নিম্নমানের গবেষণার অভিযোগ যাতে না ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘আমরা চাই মানসম্মত গবেষণা এবং সেই মানসম্মত গবেষণার মাধ্যমে মানসম্মত পিএইচডি।’
তিনি বলেন, দেশে যোগ্য শিক্ষক ও গবেষকের ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় উচ্চতর গবেষণার সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে দক্ষ শিক্ষক ও গবেষকের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
ইউজিসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি চালুর সুযোগ দেওয়া হলে তা দেশের গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার সক্ষমতা ও একাডেমিক পরিবেশ আরও উন্নত করারও প্রয়োজন হবে।
তবে পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কঠোর মানদণ্ড আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। কারণ গবেষণার মান ও একাডেমিক সততা নিশ্চিত করা না গেলে পিএইচডি ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা ও একাডেমিক পরিবেশ যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ট্রাস্টি বোর্ডকে একাডেমিক কাজে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও অনুষ্ঠানে কথা বলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ও একাডেমিক প্রশাসনকে নিজ নিজ দায়িত্বের সীমারেখা মেনে কাজ করতে হবে। একাডেমিক প্রশাসনের কাজে ট্রাস্টি বোর্ডের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ট্রাস্টি বোর্ড এবং একাডেমিক প্রশাসনের দায়িত্ব ও ক্ষমতার ক্ষেত্র স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। ট্রাস্টি বোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত ও পরিচালনাগত বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবে, আর একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত একাডেমিক কাঠামোর মাধ্যমে।
তিনি জানান, বর্তমানে ইউজিসিকে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ট্রাস্টি বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রশাসনের মধ্যকার বিরোধও সামলাতে হচ্ছে।
এ ধরনের বিরোধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করে ইউজিসি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা কাঠামোর বিভিন্ন পক্ষকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান।
গবেষণায় উৎকর্ষ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যান গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন এবং গবেষকদের উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পাঠদাননির্ভর না রেখে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষ করে যোগ্য শিক্ষক ও গবেষকের ঘাটতি পূরণে দেশে পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন গবেষক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা খাতে দক্ষ মানবসম্পদও গড়ে উঠবে।
ইউজিসির বিবেচনায় থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কোন মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে এবং অনুমোদনের পর গবেষণার মান কীভাবে তদারক করা হচ্ছে—তার ওপর।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, দক্ষ গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক, পর্যাপ্ত গবেষণা অবকাঠামো, গবেষণায় অর্থায়ন এবং একাডেমিক সততা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে দেখা হবে বলে ইউজিসি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক এবং ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক অধ্যাপক তানভীর ফেরদৌস সাঈদ।
গবেষণায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে আয়োজিত ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা কার্যক্রম ও গবেষকদের বিভিন্ন অর্জনের বিষয়ও তুলে ধরা হয়।