
সকালে ঘুম ভাঙার পরই ৭৮ বছর বয়সী জয়েস থমাসের মনে প্রশ্ন জাগে—আজ কী হবে? রাতে ঘুম আসে না। খাবারের প্রতিও আগের মতো রুচি নেই। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে এমন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এই ব্রিটিশ নার্স, যার কথা কখনো ভাবেননি তিনি।
২২ বছর আগে স্বামীর হাত ধরে যে সুইডেনে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন জয়েস, এখন সেই দেশই তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অথচ সুইডেনেই কেটেছে তাঁর জীবনের দুই দশকের বেশি সময়। এখানেই তাঁর ঘর, ছেলে, নাতি-নাতনি, বন্ধু ও পরিচিতজনেরা। এমনকি তিন বছর আগে ক্যানসারে মারা যাওয়া স্বামীর কবরও রয়েছে এই দেশেই।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী বসবাসের মর্যাদা সংক্রান্ত একটি আবেদনের জটিলতায় এখন সেই সবকিছু ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন জয়েস।
জানতেনই না আবেদন করতে হবে
জয়েসের সমস্যার সূত্রপাত ব্রেক্সিটের পর। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যায়। এর ফলে ব্রিটিশ নাগরিকেরা আর ইইউর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হননি। ফলে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে আগের মতো অবাধে বসবাসের অধিকারও আর বহাল থাকেনি।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী চুক্তির আওতায় সুইডেনে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁদের সুইডেনে বসবাসের অধিকার বা মর্যাদার জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল। সেই আবেদনের সময়সীমা শেষ হয় ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
কিন্তু জয়েস ও তাঁর স্বামী সেই আবেদন করেননি।
জয়েসের ভাষ্য, তাঁরা জানতেনই না যে এ ধরনের আবেদন করা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে সুইডেনে ফিরে আসার চেষ্টা করার সময় প্রথমবার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। এরপর শুরু হয় তাঁর আবেদন, প্রত্যাখ্যান ও আপিলের দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
নিজের বাড়িতে বিবিসিকে জয়েস বলেন, “এটা একেবারে নরকের মতো। আমি ঘুমাতে পারছি না, খেতে পারছি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি না, কী হতে যাচ্ছে।”
আবেদন ও আপিলেও মেলেনি সমাধান
সুইডেনে থাকার অধিকার ধরে রাখতে এরপর একাধিকবার আবেদন করেন জয়েস। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলও করেন। কিন্তু তাঁর আবেদন ও আপিল কোনোটি সফল হয়নি।
গত মাসে সুইডেনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ মাইগ্রেশনসভেরকেট তাঁকে জানায়, স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ার জন্য ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় রয়েছে তাঁর।
অর্থাৎ ২২ বছর ধরে যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশেই এখন তাঁর থাকার বৈধ অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জয়েসের আইনজীবীরা তাঁকে সুইডেন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। আর এই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
জয়েস বলেন, “আমি ক্লান্ত, সত্যিই আমি ক্লান্ত। আর আমি তো এখন তরুণ নই। সহানুভূতি কোথায়? আমি এখানে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছি। এখানে আমার বন্ধু আছে, পরিবার আছে।”
তাঁর কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় শুধু একটি দেশ ছেড়ে যাওয়া নয়। সুইডেন ছাড়তে হলে ছেলে, নাতি-নাতনি, বন্ধু এবং পরিচিত জীবন—সবকিছু থেকে দূরে যেতে হবে তাঁকে। সবচেয়ে বড় কথা, তিন বছর আগে মারা যাওয়া স্বামীর কবরটিও পেছনে ফেলে যেতে হবে।
শুধু জয়েস নন, একই সমস্যায় আরও অনেকে
জয়েস থমাসের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে বসবাসকারী আরও কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক একই ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুইডেন থেকে যুক্তরাজ্যের ২ হাজার ৪৯০ জন নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশে দেশ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি। অর্থাৎ মোট সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সুইডেনে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিক।
সুইডেনের মাইগ্রেশনসভেরকেট জয়েসের ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে তাঁর অনুমতি ছাড়া মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। একইভাবে বর্তমানে কতজন ব্রিটিশ নাগরিক সুইডেনে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন, সে প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর দেয়নি সংস্থাটি।
তবে গত সপ্তাহে দ্য গার্ডিয়ানকে সংস্থাটি জানিয়েছে, ব্রেক্সিটের পর থেকে ৪৫৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে সুইডেন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে অথবা জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
দুই দশক পরও দেশ ছাড়ার হুমকি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে
ব্রেক্সিট-পরবর্তী এই জটিলতার আরেকটি দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে সুইডেনে বসবাসকারী এক পরিবারের ক্ষেত্রে। গত মাসে ওই পরিবার বিবিসিকে জানিয়েছিল, দুই দশকের বেশি সময় ধরে সুইডেনে বসবাস করা তাদের বাবাকেও দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ওই ব্যক্তি ডিমেনশিয়া ও ভাসকুলার পারকিনসনিজমে আক্রান্ত। বর্তমানে সুইডেনের একটি পরিচর্যাকেন্দ্রে পূর্ণকালীন চিকিৎসা ও সেবা নিচ্ছেন তিনি।
এই ঘটনাগুলো নিয়ে সুইডেনের অভিবাসননীতি ও ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
‘নিয়মগুলো উদারভাবে প্রয়োগ করা উচিত’
জয়েসের মতো ব্যক্তিদের পরিস্থিতি নিয়ে সুইডিশ সরকারের অবস্থানও কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল বলেছেন, বর্তমান নিয়মের কাঠামোটি আগের সরকার চালু করেছিল। তবে বর্তমান সরকার পরিস্থিতিটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে।
বিবিসিকে তিনি বলেন, যারা ব্রেক্সিট-পরবর্তী নিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করার কোনো সুযোগ আছে কি না, সরকার তা খতিয়ে দেখবে।
জয়েস থমাসের ঘটনা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ফোরসেল বলেন, সরকার মনে করে, নিয়মগুলো উদারভাবে প্রয়োগ করা উচিত।
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্য সুইডেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। আমরা চাই, সুইডেনে বসবাস ও কর্মরত ব্রিটিশ নাগরিকেরা যেন এখানেই থাকতে পারেন।”
এ বিষয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকার আলোচনা করছে বলেও জানান তিনি।
জয়েসের পাশে বিরোধী দলের এমপি
জয়েস থমাসের নির্বাচনী এলাকার বিরোধী দল ভ্যানস্টেরপারিয়েট বা দ্য লেফট পার্টির আইনপ্রণেতা হোকান সভেনেলিং সরকারের অভিবাসননীতির সমালোচনা করেছেন।
তিনি জয়েসের ঘটনাকে সরকারের “অমানবিক অভিবাসননীতির” উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিবিসিকে সভেনেলিং বলেন, তিনি আশা করছেন, সুইডেনের পরবর্তী নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে এবং অভিবাসননীতিতে পরিবর্তন ঘটবে। তাঁর মতে, এমন পরিবর্তন হলে জয়েসের মতো দীর্ঘদিন সুইডেনে বসবাসকারী এবং দেশটির সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক থাকা ব্রিটিশ নাগরিকেরা সেখানে থাকার সুযোগ পেতে পারেন।
যুক্তরাজ্যেরও নজর রয়েছে
জয়েসের ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়নবিষয়ক দপ্তর।
দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, সুইডিশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করবে—এমন বক্তব্যকে তারা স্বাগত জানায়। এ বিষয়ে সুইডিশ কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতেও যুক্তরাজ্য প্রস্তুত।
তবে জয়েসের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
২২ বছর আগে স্বামীর হাত ধরে যে দেশে এসেছিলেন, সেই সুইডেনেই তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে। এখানে তিনি সংসার করেছেন, কাজ করেছেন, বন্ধুত্ব গড়েছেন এবং পরিবারকে ঘিরে জীবন কাটিয়েছেন। তিন বছর আগে স্বামীকে হারানোর পরও এই দেশেই থেকে গেছেন। স্বামীর কবরও রয়েছে এখানেই।
এখন সেই ঘর, পরিবার, বন্ধু ও স্বামীর কবর—সবকিছু পেছনে ফেলে তাঁকে চলে যেতে হতে পারে।
৭৮ বছর বয়সী জয়েসের কাছে তাই সুইডেন ছেড়ে যাওয়ার অর্থ কেবল একটি দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়া নয়। এর অর্থ হতে পারে তাঁর জীবনের দুই দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা পরিচিত পৃথিবীটিকেই পেছনে ফেলে যাওয়া।