
বদরুদ্দীন উমর তাঁর লেখায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং এ দেশের শাসকশ্রেণির চরিত্র বিশ্লেষণ করে গেছেন। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের বয়ান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বয়ানের ওপর নির্ভর করে দেশে যে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন আলোচকেরা।
তাঁরা বলেন, ওই শাসনামলে জনগণের ওপর গুম, ক্রসফায়ার, বিনা বিচারে আটক ও মিথ্যা মামলার মতো নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছিল। এসবের বিরুদ্ধে বদরুদ্দীন উমর তাঁর লেখার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন ও কমরেড বদরুদ্দীন উমর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বদরুদ্দীন উমরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল এ সভার আয়োজন করে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ফয়জুল হাকিম।
‘বদরুদ্দীন উমর কেবল ব্যক্তি ছিলেন না’
ফয়জুল হাকিম বলেন, বদরুদ্দীন উমর শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতিবিদ এবং এ দেশের সর্বশ্রেণির প্রতিনিধি।
তিনি বলেন, বদরুদ্দীন উমর যে অসমাপ্ত কাজ রেখে গেছেন এবং যে বিপ্লব, বিশেষ করে সর্বহারা বিপ্লবের জন্য কাজ করে গেছেন, সেই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁদের ওপর রয়েছে।
ফয়জুল হাকিম বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর কেবল ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতিবিদ, এ দেশের সর্বশ্রেণির একজন প্রতিনিধি। তিনি যে অসমাপ্ত কাজ করে গিয়েছেন, যে বিপ্লবের জন্য, যে সর্বহারা বিপ্লবের জন্য তিনি কাজ করে গেছেন, সেই কাজের পূর্ণতা দিতে আমাদেরকে কাজ করতে হবে।’
‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে লুণ্ঠনজীবী পুঁজির বিশ্লেষণ’
বদরুদ্দীন উমরের ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ’ গ্রন্থের প্রসঙ্গ তুলে ফয়জুল হাকিম বলেন, ওই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে বাংলাদেশে লুণ্ঠনজীবী পুঁজি গড়ে উঠেছিল।
তাঁর দাবি, বদরুদ্দীন উমর তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে ওই শ্রেণি শিল্প, উৎপাদন কিংবা কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল না। ঘুষ, দুর্নীতি, চোরাচালান ও লুটপাটের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি ব্যবসায়ী শ্রেণি দেশের শাসনক্ষমতা দখল করেছিল বলে তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেছিলেন।
ফয়জুল হাকিমের ভাষ্য, বদরুদ্দীন উমরের এসব বিশ্লেষণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
‘জুলাই অভ্যুত্থানের পরও শাসকশ্রেণির পরিবর্তন হয়নি’
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় সংসদ, সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফয়জুল হাকিম।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ যেভাবে গঠিত হয়েছে এবং সরকার ও বিরোধী দল হিসেবে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা মূলত একই লুণ্ঠনজীবী শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে।
তাঁর মতে, এই শ্রেণির পক্ষে জনগণের মৌলিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তাঁরা ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দ বাদ দিতে পারেন, কিন্তু এর বাইরে তাঁদের করার মতো খুব বেশি কিছু নেই।
‘ধর্ম ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে’
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রসঙ্গেও কথা বলেন ফয়জুল হাকিম। এ বিষয়ে সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করতে ধর্মকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, গাজায় যখন ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হয়েছে, তখন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কোথায় ছিল।
ফয়জুল হাকিম বলেন, শাসকশ্রেণি জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে বাংলাদেশ কোনো সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধজোটে যাবে না—এ বিষয়ে তিনি দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন।
আলোচনায় আরও যারা
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পাভেল চৌধুরী, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (এমএল) সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিম এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সদস্য মিনহাজ আহমেদসহ অন্যরা।
বক্তারা বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা, তাঁর লেখালেখি এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলনে তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর অসমাপ্ত রাজনৈতিক কাজ ও চিন্তাধারাকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।