
রয়টার্স—প্যারিস
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে পড়লেও চীনের কাছ থেকে শত কোটি ডলারের পণ্য কিনছে ইরান। এসব পণ্যের মধ্যে ওষুধ, যানবাহন, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং সামরিক সরঞ্জামও রয়েছে।
রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইরান ও চীন এ বাণিজ্যে অনেকটা ‘পণ্য বিনিময়’ বা বার্টার ব্যবস্থার মতো একটি গোপন আর্থিক কাঠামো ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে ইরানি তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি ডলার হিসেবে ইরানে ফেরত না গিয়ে চীনে ইরানের নামে ‘ক্রেডিট’ হিসেবে জমা হচ্ছে। পরে সেই অর্থ ব্যবহার করেই চীনা পণ্য কেনা হচ্ছে।
ইরানের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং আরও তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়টার্সকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তবে নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক সংবেদনশীলতার কারণে তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
এই ব্যবস্থায় ইরান চীনে তেল পাঠানোর পর তার মূল্য নগদ অর্থ হিসেবে গ্রহণ করে না। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিশেষ করে সুইফটের মাধ্যমে ডলার লেনদেন হলে তা মার্কিন নজরদারির আওতায় পড়তে পারে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসার ঝুঁকি থাকে। তাই তেলের মূল্য চীনে থাকা একটি বিশেষ ফান্ড বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইরানের নামে ক্রেডিট হিসেবে জমা রাখা হয়।
ইরান পরে চীন থেকে যন্ত্রাংশ, গাড়ি, অন্যান্য পণ্য কিংবা সামরিক সরঞ্জাম কিনলে নগদ অর্থের পরিবর্তে ওই জমা থাকা ক্রেডিট ব্যবহার করে মূল্য পরিশোধ করে।
বিষয়টিকে সহজভাবে একটি শপিং মলের ‘উপহার কার্ড’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেমন কোনো ব্যক্তি কার্ডে অর্থ জমা রেখে পরে সেই মল থেকেই পণ্য কিনতে পারেন, তেমনি ইরান তেলের বিনিময়ে চীনে নিজেদের নামে ক্রেডিট জমা রাখছে এবং সেই ক্রেডিট ব্যবহার করে চীন থেকেই প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলোর ভাষ্য, অন্তত ২০২১ সাল থেকে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। গত এক বছরে বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) মাধ্যমে এ ব্যবস্থায় ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
তবে রয়টার্স এসব লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই করতে পারেনি।
তেলের বিনিময়ে পণ্য, এড়ানো হচ্ছে ডলার লেনদেন
দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি তেলের ক্রেতার সংখ্যা সীমিত। এই পরিস্থিতিতে চীন ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ক্রেতা হয়ে উঠেছে।
পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে জাহাজে করে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। দেশটি প্রতিদিন গড়ে ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক চীন ইরানের তেল তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগও ধরে রেখেছে। একই সময়ে চীনের যেসব ব্যাংক ও কোম্পানি ইরানে পণ্য রপ্তানি করে, তাদের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারির ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইরানের তেল বিক্রির অর্থের একটি অংশ চীনে রাখা হয়। পরে সেই অর্থ ইরানে পণ্য রপ্তানি করা চীনা কোম্পানি কিংবা দেশটিতে অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা পরিশোধে ব্যবহার করা হয়।
ফলে ইরানকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ডলার পাঠাতে হয় না। একই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি এমন আর্থিক লেনদেন করতে হয় না, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
রয়টার্সের কাছে তথ্য দেওয়া তিনটি সূত্র জানিয়েছে, চুইশিন নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবস্থায় ইরানি তেল বিক্রির অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়। বাকি অর্থ রাখা হয় একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) হিসাবে।
গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এই ব্যবস্থার কথা জানিয়েছিল।
চুইশিন নামে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়ে রহস্য
এই ব্যবস্থার সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি।
তাঁদের ভাষ্য, ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একটি ক্রেতা অন্তত চলতি বছর পর্যন্ত চীনে অপরিচিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রতি মাসে শত শত কোটি ডলার জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘চুইশিন’।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই ব্যক্তিরা জানান, ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হংকংয়ে নিবন্ধিত একটি কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় এসব অর্থ জমা দেওয়া হতো।
এরপর চুইশিন চীনা রপ্তানিকারক এবং ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোকে অর্থ পরিশোধ করত। ধারণা করা হচ্ছে, এই অর্থ স্থানান্তরের জন্য চীনের আরও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হতো।
তবে রয়টার্স চীনা কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত কোনো নথিতে ‘চুইশিন’ নামে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের রেকর্ড খুঁজে পায়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করে বলে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোরও কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
একটি সূত্রের দাবি, ‘চুইশিন’ হয়তো কেবল একটি স্প্রেডশিটে ব্যবহৃত নাম।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (এনআইওসি) ও ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করে বলে কথিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একই নামে হংকংয়ের কোম্পানি নিবন্ধন তালিকায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানার কাঠামো বা ব্যবসায়িক লেনদেনের কোনো প্রকাশ্য নথি রয়টার্স খুঁজে পায়নি।
নিবন্ধিত ঠিকানায় প্রশ্ন পাঠিয়েও এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ওই ঠিকানাগুলো এমন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, যারা অন্য কোম্পানিকে প্রশাসনিক সেবা দিয়ে থাকে।
এসপিভির মাধ্যমে শত কোটি ডলারের লেনদেন
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের ঘনিষ্ঠ দুই সূত্র এসপিভির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, চীন ও ইরানের মধ্যে গোপন বাণিজ্যে এই কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পাঁচটি সূত্রই জানিয়েছে, এসপিভিতে থাকা অর্থ পরিচালনা করে দুটি প্রতিষ্ঠান। এর একটি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করে এবং অন্যটি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আমদানিকারককে এসপিভিতে থাকা অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন দিলে ইরানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি চীনা প্রতিষ্ঠানটিকে তা জানায়। এরপর ইরানে পণ্য সরবরাহকারী চীনা কোম্পানিগুলোর অর্থ পরিশোধ করা হয়।
রয়টার্সের কাছে তথ্য দেওয়া সূত্রগুলোর হিসাবে, গত এক বছরে এসপিভির মাধ্যমে ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সব কটি সূত্রই জানিয়েছে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান চীন থেকে ওষুধ, যানবাহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম কিনেছে। এসব পণ্যের নির্মাতারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করেনি এবং তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কোনো ইঙ্গিতও নেই।
গত এক বছরে অন্তত একবার কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ইরানে সরবরাহের একটি চুক্তিতেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে এসব লেনদেনে জড়িত চীনা নির্মাতাদের বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। ফলে ওই সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টিও স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
মার্কিন চাপ বাড়লেও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার অভিযোগে চীনের ঝুহাই ঝেনরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান ও ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্কের একটি নথিও রয়টার্সের হাতে এসেছে।
একটি সূত্র ২০২৫ সালের ২২ জুলাইয়ের বলে দৃশ্যমান একটি চিঠি রয়টার্সকে দিয়েছে। চিঠিতে ঝুহাই ঝেনরংয়ের কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। এটি দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্কের একটি প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়।
তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে চিঠিটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
এই গোপন বাণিজ্যব্যবস্থায় নিজেদের ভূমিকা এবং ওই নথি সম্পর্কে জানতে এনআইওসি ও ঝুহাই ঝেনরংয়ের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল রয়টার্স। তারা কোনো জবাব দেয়নি। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল কেনা বা পরিবহনে সহায়তা করা চীনের কিছু ছোট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন চীনের বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ার মধ্যেই এ ব্যবস্থা তেহরানের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইরান ও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর তেহরানও চুক্তির কিছু শর্ত মানা বন্ধ করে দেয়। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপের দেশগুলো ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কিছু নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। এর মধ্যে ইরানে অধিকাংশ বড় ধরনের প্রচলিত অস্ত্র রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল। ইরান ও চীন এ পদক্ষেপকে ‘আইনগত ও প্রক্রিয়াগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করে।
২০২১ সালে ইরান ও চীন ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। এতে জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তিটির বিস্তারিত প্রকাশ্যে খুব বেশি জানানো হয়নি।
যুদ্ধ ও হরমুজ অবরোধের নতুন চাপ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি আবার সচল করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে তেহরানের ওপর চাপও বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন।
গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে, তাদের সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। তা না হলে সেসব দেশকে ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের অংশ হিসেবে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আরোপের কারণে চীনের সঙ্গে ইরানের এই পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় কী প্রভাব পড়েছে, তা রয়টার্স নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি।
গত সপ্তাহে রয়টার্স জানিয়েছিল, ১৪ জুলাই অবরোধ পুনর্বহাল হওয়ার পর থেকে কোনো ইরানি অপরিশোধিত তেলের চালান সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চীনে যেতে পারেনি।
ফলে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে চীনে জমা থাকা ক্রেডিট ব্যবস্থাও কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
চীনের অবস্থান
চীন ও ইরান পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপ করা একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে বারবার অবৈধ বলে নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার করেছে।
পণ্য বিনিময়ের মতো বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এমন কোনো পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত নয়।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনে যার কোনো ভিত্তি নেই এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদন করেনি, এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে চীন।
নিউইয়র্ক ও জেনেভায় ইরানের জাতিসংঘ মিশনের কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছিল রয়টার্স। তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।
হোয়াইট হাউসের কাছেও এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা থেকে দেশটিকে বিরত রাখা যায়।
তবে চীন ও ইরানের কথিত গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করেননি।
চীনেরও স্বার্থ, ইরানেরও বাঁচার পথ
ইরান ও চীনের এই ব্যবস্থায় দুই পক্ষেরই স্বার্থ রয়েছে। ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার না করেও তার তেলের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতে পারছে।
অন্যদিকে চীন তুলনামূলক কম দামে ইরানি তেল কেনার সুযোগ ধরে রাখতে পারছে এবং দেশটির রপ্তানিকারকেরা ইরানে পণ্য পাঠিয়ে অর্থ পাওয়ার বিকল্প একটি ব্যবস্থা পাচ্ছেন।
চীনের এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞানীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের কৌশল হিসেবেও দেখছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লি। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা ঘিসেল্লির মতে, চীন দেখাতে চাইছে যে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে দেশটির ওপর সহজে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
তবে তাঁর মতে, চীনের নেতারাও চান না দেশটির ব্যাংক বা কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ুক। ফলে এমন একটি ব্যবস্থা তাদের জন্য সুবিধাজনক, যেখানে প্রয়োজন হলে তারা দাবি করতে পারে যে এই লেনদেন সম্পর্কে তারা অবগত নয়।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই ইরান-চীন বাণিজ্যের গোপন কাঠামোটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তেহরানকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে তেল ও পণ্যের বিনিময়ভিত্তিক ব্যবস্থা সেই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনেকটাই পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করছে।
ফলে ইরানের জন্য তেল এখন শুধু জ্বালানি সম্পদ নয়; নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রয়োজনীয় পণ্য, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহের এক ধরনের বিকল্প মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। আর চীনের সঙ্গে গড়ে ওঠা এই অপ্রকাশ্য আর্থিক কাঠামোই তেহরানের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ সামলে টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।
:::