
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া উদ্যোগে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে। বিতর্কিত এই পরিকল্পনা স্থগিত রাখার বিষয়ে নিম্ন আদালতের আদেশ প্রত্যাহারে ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
সোমবার দেওয়া এ সিদ্ধান্তের ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ডাকযোগে ভোটের ওপর নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করার পথ আপাতত বন্ধ থাকল। নয় সদস্যের সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে থাকা ছয় রক্ষণশীল বিচারপতির মধ্যে দুজন সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
‘আইনসম্মত হতে পারে, তবে সময় খুব কম’
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে একমত হয়ে দেওয়া পৃথক রায়ে বিচারপতি ব্রেট কাভানা বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনাটি আইনসম্মত হতে পারে। তবে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তা বাস্তবায়নের জন্য অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই।
অর্থাৎ, আদালতের সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের উদ্যোগকে চূড়ান্তভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি। বরং নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় এখনই নতুন বিধি কার্যকর করার বাস্তবতা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।
নর্থ ক্যারোলাইনাসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এরই মধ্যে ভোটারদের কাছে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার জন্য ব্যালট পাঠানো শুরু হয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এই পর্যায়ে নিয়ম পরিবর্তন করলে ভোট পরিচালনায় বিভ্রান্তি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে—আদালতের সিদ্ধান্তে সেই বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ
ডাকযোগে ভোটের সুযোগ সীমিত করতে গত মার্চে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। ওই আদেশে ডাকযোগে ভোটে জালিয়াতির ঝুঁকি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি ট্রাম্প।
নির্বাহী আদেশ জারির পরপরই এর বিরুদ্ধে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জ আসে। ডেমোক্র্যাট–নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এবং অন্যান্য পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়।
তাদের মূল যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কীভাবে আয়োজন ও পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর বিস্তৃত সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। ফেডারেল সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেই ক্ষমতার ওপর ব্যাপক হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।
অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা বনাম প্রেসিডেন্টের উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভোটার নিবন্ধন, ব্যালটের ব্যবস্থা, ভোটগ্রহণের পদ্ধতি এবং নির্বাচনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বড় অংশই অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগকে ঘিরে আইনি বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু তাই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় অঙ্গরাজ্যগুলোর সাংবিধানিক কর্তৃত্ব।
ডেমোক্র্যাট–নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোর করা মামলায় বলা হয়েছে, ফেডারেল সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এমন পরিবর্তন চাপিয়ে দিতে পারে না, যা অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতাকে খর্ব করে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনিয়ম ও জালিয়াতির ঝুঁকি কমাতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন রয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কেন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের নির্বাচনকে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। আগামী নভেম্বরের নির্বাচন তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের জন্য ভোট হবে। ফলে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে যেকোনো বড় পরিবর্তনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যাপক হতে পারে।
বিশেষ করে ডাকযোগে ভোট যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। দূরে থাকা ভোটার, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ভোটার কিংবা নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে যেতে না পারা নাগরিকদের একটি বড় অংশ এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ডাকযোগে ভোটের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনতে গেলে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নতুন ব্যালট, নির্দেশনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হতো।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে আপাতত সেই পরিবর্তনের পথ আটকে গেল। তবে বিচারপতি কাভানার বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার বৈধতা নিয়ে আদালতে আরও বিস্তৃত আইনি লড়াই হতে পারে।
নির্বাচনী আইন নিয়ে নতুন বিতর্ক
ডাকযোগে ভোট নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ট্রাম্প বারবার ডাকযোগে ভোটের মাধ্যমে অনিয়মের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য তাঁর এসব দাবির বিরোধিতা করে আসছে।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশে মূলত আসন্ন নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন বর্তমান নিয়মেই অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী ক্ষমতা নিয়ে বিরোধের অবসান হচ্ছে না। বরং ডাকযোগে ভোটের ভবিষ্যৎ কাঠামো, ফেডারেল সরকারের ক্ষমতার সীমা এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে এই আইনি লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে।
তথ্যসূত্র: এএফপি