
স্থানীয় বিএনপির বিরোধিতা, তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার কর্মসূচি এবং অনুষ্ঠান বন্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আপত্তি জানানোর পরও নিজ নির্বাচনী এলাকায় অনুষ্ঠান করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।
রুমিন ফারহানার বাবা ভাষাসৈনিক অলি আহাদ স্মরণে আশুগঞ্জের আবদুল কাদির শাহ পাঠাগার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে ২০২৫ সালে প্রাথমিকের বৃত্তি পাওয়া এবং ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। আয়োজকদের হিসাবে, অনুষ্ঠানে মোট ১৯৫ জন শিক্ষার্থীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানকে ঘিরে আগে থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছিল। একদিকে উপজেলা বিএনপির নেতারা রুমিন ফারহানার বিরোধিতা করে তাঁকে আশুগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর অনুসারীরা অনুষ্ঠান সফল করতে এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভ ও অবাঞ্ছিত ঘোষণার পর অনুষ্ঠান
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিএনপিকে নিয়ে দেওয়া রুমিন ফারহানার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গত ১২ সেপ্টেম্বর আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপি তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও ঝাড়ুমিছিল করে। আশুগঞ্জ বাজারে আয়োজিত ওই কর্মসূচি থেকে তাঁকে উপজেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। গত বুধবার আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পেছনের মাঠে রুমিন ফারহানার দুই অনুসারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের শিকার দুজন হলেন আশুগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক আতাউর রহমান ও সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল বিপ্লব। তাঁরা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রুমিন ফারহানার পক্ষে কাজ করায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। হামলার পর তাঁরা আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।
হামলার বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুষ্ঠান বন্ধে ইউএনওর কাছে আপত্তি
অনুষ্ঠানের আগের দিন বুধবার আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান সিরাজ, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানসহ দলের নেতা-কর্মীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অনুষ্ঠানটি বাতিলের দাবি জানান। তাঁদের আপত্তির কারণে অনুষ্ঠানটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়নি। শুক্রবার নির্ধারিত সময়েই উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
এদিকে অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোলপ্লাজা থেকে উপজেলা পরিষদ চত্বর পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়।
সরাইল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশে পুলিশের ৫০ জন সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
দুই শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে অনুসারীরা
অনুষ্ঠানকে ঘিরে রুমিন ফারহানার অনুসারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে দুই শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে অনুসারীরা অনুষ্ঠানস্থলে আসেন। তাঁরা রুমিন ফারহানার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ফলে একদিকে স্থানীয় বিএনপির বিরোধিতা, অন্যদিকে রুমিন ফারহানার অনুসারীদের সক্রিয় উপস্থিতি—দুই পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
অলি আহাদের অবদান তুলে ধরলেন রুমিন
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রুমিন ফারহানা তাঁর বাবা ভাষাসৈনিক অলি আহাদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় এবং এরপর ভাষাসৈনিক অলি আহাদ যে ত্যাগ ও অবদান রেখেছেন, তা দেশের ইতিহাসে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার ধরন নিয়েও সমালোচনা ছিল। তাঁর ভাষ্য, দেশে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের বয়ান অনুযায়ী অনেক সময় ইতিহাস রচিত হয়। এ কারণে অলি আহাদ, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো নেতাদের জীবন, সততা, দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক ভূমিকা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি লাঠিখেলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনও ছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জামাল হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
‘রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবে’
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রুমিন ফারহানা। তাঁকে আশুগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টিকে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবে এবং কাউকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করাও রাজনীতির অংশ। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব মানুষই দেয়।
তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে চলমান বিরোধের বিষয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেন তিনি। তবে উপজেলা বিএনপির নেতারা এর আগে রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করেছেন এবং তাঁর এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে বিরোধের পটভূমি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানাকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে বিরোধ নতুন নয়। এর আগে দলটির স্থানীয় একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী তাঁকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে তাঁর মনোনয়ন ঠেকাতে একজোট হয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, দীর্ঘদিন ধরে সরাইল ও আশুগঞ্জে রাজনীতি করা স্থানীয় নেতাদের মধ্য থেকে কাউকে প্রার্থী করা উচিত।
অবশ্য আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং রুমিন ফারহানার পারিবারিক শিকড়ের বিষয়টি সামনে আসার পর ‘বহিরাগত’ বিতর্কেরও পরিবর্তন হয়েছে। রুমিন ফারহানার পৈতৃক বাড়ি বিজয়নগরের বুধন্তী এলাকায় এবং তিনি সরাইলের শাহবাজপুরের বাসিন্দা ও ভোটার—এমন তথ্যও স্থানীয় পর্যায়ে উঠে এসেছে।
এদিকে বর্তমানে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়েও তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে স্থানীয় বিএনপির একাংশের সঙ্গে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
নির্বাচনী কার্যক্রম ঘিরেও টানাপোড়েন
রুমিন ফারহানার নির্বাচনী তৎপরতা ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগে সরাইলের অরুয়াইল বাজারে তাঁর একটি পথসভার জন্য তৈরি মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। মঞ্চে সভা করতে না পেরে নিজের গাড়িতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা।
এ ছাড়া নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও বিচারিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির নোটিশে তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকি ও বিচারিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। একই ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় দুই নেতাকেও পৃথক অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে নির্বাচনী এলাকায় রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় বিএনপির একাংশের বিরোধিতাও প্রকাশ্য হচ্ছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে যা বললেন
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকেরা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়েও রুমিন ফারহানার কাছে জানতে চান।
জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যেকোনো সময় দেশ ছাড়তে পারেন এবং যেকোনো সময় দেশে প্রবেশ করতে পারেন। সংবিধানে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে দেশে ফেরার পর সরকারের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটি সরকারের বিষয় বলে উল্লেখ করেন রুমিন ফারহানা।
বিরোধের মধ্যেও রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত
আশুগঞ্জের শুক্রবারের অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও এর আগে-পরে স্থানীয় রাজনীতিতে যে টানাপোড়েন দেখা গেছে, তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি দিক তুলে ধরছে। রুমিন ফারহানাকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপির একাংশের আপত্তি, তাঁর অনুসারীদের সক্রিয়তা এবং প্রশাসনের বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি কেবল একটি শিক্ষার্থী সম্মাননা অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধেরও একটি দৃশ্যমান মঞ্চ হয়ে উঠেছিল।
তবে অনুষ্ঠানে ১৯৫ শিক্ষার্থীকে সম্মাননা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে মূল সামাজিক কার্যক্রমটি সম্পন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও নির্বাচনী এলাকায় নিজের উপস্থিতি ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অবস্থানই এদিন তুলে ধরেছেন রুমিন ফারহানা।