
‘জীবন যাবে, জুলাই দিব না। চাঁদাবাজি, আধিপত্যবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ হবে। এ জন্য সংসদের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদ থাকবে, বাইরে চলবে আন্দোলন।’
১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে এ কথা বলেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সমস্ত অপশক্তি, অন্যায় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালিয়ে যাব। আমরা বিশ্রাম নেব না। আমরা নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায় করতে। সেই অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব।’
আট দফা দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব দাবি যেকোনো সময় জাতির প্রয়োজনে এক দফায় পরিণত হতে পারে। তাঁর ভাষায়, সারা দেশ থেকে এখন ‘আর সহ্য হয় না, আপনারা একটা কিছু করেন’—এমন আওয়াজ আসছে। কিছু হওয়ার আগেই সরকারের ‘শুভবুদ্ধির উদয়’ হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। তা না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন জামায়াতের আমির।
‘জুলাই বাস্তবায়ন হবে’
লংমার্চ ঘিরে নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমর্থনের কথা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার মা-বোন নেমে তাঁদের উৎসাহ দিয়েছেন এবং সংহতি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যে আন্দোলনে মায়েরা নেমেছেন, এ আন্দোলন সফল হবেই ইনশা আল্লাহ। আমরা যে কথা দিয়েছি জাতিকে, আমরা যেন বেইমান না হই, আমরা যেন জাতির সঙ্গে প্রতারণা না করি, বিশ্বাসঘাতকতা না করি। আমাদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন। জুলাই বাস্তবায়ন হবে। আপনাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে।’
জামায়াতের আমির বলেন, চট্টগ্রামে প্রথম লংমার্চের পর ঢাকা-রংপুর লংমার্চের আগে আরও দুটি দাবি যুক্ত হয়েছে। এতে ১১-দলীয় ঐক্যের ঘোষিত দাবি আটটিতে দাঁড়িয়েছে। তাঁর দাবি, এগুলো কোনো একটি দলের দাবি নয়; বরং ১৮ কোটি মানুষের অধিকারসংশ্লিষ্ট দাবি।
‘সরকার গণভোটের রায় মানেনি’
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রংপুরে এসে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতীয় নেতার মুখ থেকে জনগণের জন্য যে আহ্বান আসবে, জাতির প্রতি এটি হচ্ছে তার অঙ্গীকার। তিনি কি তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন? তিনি গণভোটের রায় মানেন নাই।’
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বরের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশেও তিনি বলেছিলেন, ঘোষিত দাবিগুলো যেকোনো সময় এক দফায় রূপ নিতে পারে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে রংপুর অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির কথাও বলেন জামায়াতের আমির।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে লালমনিরহাটের একজন বর্তমান মন্ত্রী ‘জাগো বাহে, কোনঠে, তিস্তা বাঁচাও’—এই স্লোগান তুলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর পানিসম্পদমন্ত্রীও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শফিকুর রহমানের ভাষায়, ‘সাত মাস চলে গেল, এখন কোন দিক থেকে কোন পানিপড়া খাইলেন, নড়াচড়া আর দেখি না, কেন? এখন যে আর আপনাদের কণ্ঠে অত জোর দেখি না। জনগণকে বারবার ধোঁকা দেওয়া ঠিক হবে না।’
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ১১-দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবির একটি। লংমার্চ শুরুর সময় আয়োজকদের ঘোষিত দাবির মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিও ছিল।
চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে এবং চাঁদা না পেয়ে মানুষকে হত্যার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সরকার একই পথে চলতে থাকলে আগের সরকারের মতো পরিণতি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন জামায়াতের আমির।
এর আগে লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায়ও তিনি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।
মাঠে জায়গা না পেয়ে সড়কে অবস্থান
শনিবার দুপুরের পর থেকেই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা নেতা-কর্মীরা মিছিল ও স্লোগান নিয়ে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে প্রবেশ করতে থাকেন। একপর্যায়ে মাঠে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেকে আশপাশের সড়কে অবস্থান নেন। মাঠেই মাগরিবের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, রংপুর বিভাগের আট জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ সমাবেশে অংশ নেন। সমাবেশের সাউন্ড সিস্টেমের দায়িত্বে থাকা ডেকোরেটরকর্মী অমূল্য চন্দ্র রায় জানান, মাঠে ৮০টি এবং মাঠের বাইরে বিভিন্ন সড়কে আরও ১২০টি মাইক স্থাপন করা হয়েছিল।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম। এতে আরও বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপি নেতা সারজিস আলম, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রমুখ।
ছয় দফা থেকে আট দফা
এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে ছয় দফা দাবি সামনে রেখেছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। পরে ঢাকা-রংপুর কর্মসূচিতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত হওয়ায় দাবির সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে।
১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১-দলীয় ঐক্য আবারও তাদের দাবিগুলো নিয়ে রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছে। বিভিন্ন পথসভায় শফিকুর রহমানও আট দফা বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার কথা বলেছেন।