
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৬তম জন্মদিন উপলক্ষে দেশজুড়ে প্রদীপ জ্বালানোর কর্মসূচি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জম্মুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) শিক্ষার্থীদের ওই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করেছিল। অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং সন্তোষজনক জবাব না দিলে ৫০০ রুপি জরিমানার কথা জানানো হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে আইআইএম জম্মু কর্তৃপক্ষ বলেছে, কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জরিমানার অর্থ নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
প্রদীপ জ্বালানোর অনুষ্ঠানে উপস্থিতির নির্দেশ
১৭ সেপ্টেম্বর মোদির জন্মদিন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদীপ জ্বালানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আইআইএম জম্মুর প্রশাসনিক ভবনের সামনে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এর আগে আইআইএম স্টুডেন্টস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। সেখানে ১৭ সেপ্টেম্বর আয়োজিত প্রদীপ জ্বালানোর অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে তাকে কারণ দর্শাতে হবে। কেবল অসুস্থতার ক্ষেত্রে অনুপস্থিতির কারণ গ্রহণযোগ্য হবে। তবে এ ক্ষেত্রে আইআইএম কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত চিকিৎসকের সনদ দেখাতে হবে। সনদে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী এতটাই অসুস্থ যে তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না—এমন উল্লেখ থাকার কথাও বলা হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া কেউ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে ৫০০ রুপি জরিমানা করার কথা বলা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানেও ছিলেন বিজেপির বিধায়ক, আইআইএম পরিচালক
নির্ধারিত দিনে আইআইএম জম্মুর প্রশাসনিক ভবনের সামনে প্রদীপ জ্বালানোর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জম্মুর বিজেপি বিধায়ক যুধবীর শেঠি এবং আইআইএম জম্মুর পরিচালক অধ্যাপক বি এস সহায়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। তবে কয়েকজন শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের শৃঙ্খলাভঙ্গের নোটিশ দেওয়া হয়।
নোটিশ পাওয়ার এক দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির কারণ জানাতে বলা হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে সেই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক মনে না হলে ৫০০ রুপি জরিমানার বিধান ছিল বলে প্রকাশিত নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।
‘প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক কেন?’
আইআইএমের এই নির্দেশনা প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়। জম্মু-কাশ্মীর কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত নেতা সৈয়দ নাসির হুসেন প্রশ্ন তোলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেন বাধ্যতামূলক করা হবে।
তাঁর প্রশ্ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ কি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রচার বা জন্মদিন উদ্যাপনের আয়োজন করা? শিক্ষার্থীদের ওপর এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বিহারের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা ও সাংসদ সুহাকর সিংও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জন্মদিন উপলক্ষে প্রদীপ জ্বালানো বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজন কেন এবং অনুপস্থিত থাকলে জরিমানাই বা কেন করা হবে।
রাহুল গান্ধীরও সমালোচনা
মোদির জন্মদিনের কর্মসূচিতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি প্রদীপ জ্বালানোর কর্মসূচির সমালোচনা করেন।
রাহুলের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন রাজ্যে প্রদীপ জ্বালানোর মতো কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় করা হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন ও হোস্টেল নির্মাণে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বিশেষ করে ছাত্রীদের আবাসনসংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, আবাসনের অভাবে অনেক ছাত্রীকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করে দেওয়া ওই পোস্টে রাহুল একটি ছাত্রীর সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানতে চান, শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যার জবাব কী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদ
প্রদীপ জ্বালানোর সরকারি কর্মসূচি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে জরাজীর্ণ একটি আদিবাসী স্কুল ভবনের সামনে প্রদীপ জ্বালাতে দেখা যায় তাঁকে।
ভিডিওতে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রদীপ জ্বালাতে বলেছেন, তাই তাঁর জন্য প্রদীপ জ্বালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ওই জরাজীর্ণ স্কুল ভবনকে সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের ‘অবদান’ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ভিডিওটি মূলত সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যার তুলনা টেনে রাজনৈতিক সমালোচনার অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়।
বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি কর্মসূচি
মোদির জন্মদিন উপলক্ষে শুধু জম্মু নয়, দিল্লি, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটসহ বিভিন্ন রাজ্যেও নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে স্কুল, কলেজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রদীপ জ্বালানোর কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয় ‘আশীর্বাদের প্রদীপ’।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি নথিবদ্ধ করার জন্য শিক্ষার্থীদের ভিডিও ধারণ করে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে এটি কেবল আনুষ্ঠানিক জন্মদিন উদ্যাপন ছিল, নাকি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত উদ্যোগ—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
‘সেবা সংকল্প অভিযান’ এক মাসের কর্মসূচি
মোদির জন্মদিন উপলক্ষে বিজেপির পক্ষ থেকেও এক মাসব্যাপী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’।
১৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই কর্মসূচি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। বিজেপির পক্ষ থেকে জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জন্মদিন উদ্যাপন ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মতো আয়োজন যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে এ নিয়ে আলাদা করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনের সমালোচনা
প্রদীপ জ্বালানোর কর্মসূচি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও সমালোচনা এসেছে।
পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিপূজার প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বাধ্যতামূলক কর্মসূচি স্বাধীন চিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পিইউসিএলের অভিযোগ, এ ধরনের চর্চার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীন মতপ্রকাশের বদলে আনুগত্যনির্ভর সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জরিমানা নেওয়া হয়নি: আইআইএম কর্তৃপক্ষ
তবে বিতর্কের মধ্যে আইআইএম জম্মু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫০০ রুপি জরিমানার অর্থ নেওয়া হয়নি।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কারণ জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে যে ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা অপ্রয়োজনীয় বলেও তারা মনে করছে।
তবে নির্দেশনায় অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে জরিমানার কথা উল্লেখ থাকায় ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কোনো রাজনৈতিক বা সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা কতটা গ্রহণযোগ্য—এই প্রশ্নটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
মোদির জন্মদিন ঘিরে প্রদীপ জ্বালানোর এই কর্মসূচি তাই শুধু একটি জন্মদিন উদ্যাপনের বিষয় হয়ে থাকেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সীমারেখা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে আনুষ্ঠানিকতার ধরন—এসব বিষয়ও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।