
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর দেশের পরিবহন খাতে এর প্রভাব দ্রুতই পড়তে শুরু করেছে। সরকার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছে। অন্যদিকে লঞ্চ মালিকেরা রুটভেদে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানেও বাড়তি টাকা নেওয়া শুরু হয়েছে।
ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানেই আবার পরিবহন ব্যয় বাড়ল। যাত্রীদের সরাসরি বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে, আর পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই ব্যয়ের প্রভাব ধীরে ধীরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
সম্প্রতি সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এর আগে এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। দুই দফায় মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে ডিজেলের দাম বেড়েছে মোট ৩৫ টাকা।
ডিজেলনির্ভর বাস, লঞ্চ, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন পরিবহন এবং কৃষির অনেক যন্ত্রপাতিতে এই জ্বালানি ব্যবহৃত হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব একাধিক খাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সচিবালয়ে পরিবহন ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে বৈঠকের পর সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব জনগণের ওপর পড়বে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ যতটা সম্ভব সীমিত রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। মিনিবাসের ক্ষেত্রে ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়েছে।
দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে।
সরকার এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে না। একইভাবে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্য পরিবহনকারী অন্যান্য যানবাহনের ভাড়াও সরকারি নির্ধারিত হারের আওতায় নেই।
তবে নতুন ভাড়ার তালিকা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া থেকে দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসে রুট অনুযায়ী ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার ঘটনা দেখা গেছে।
নগর পরিবহনেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো রুটে ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা এবং ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। আবার কিছু বাসে আগের ভাড়াই নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। দূরত্বের ওপর নির্ভর করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন চালকেরা।
চালকদের যুক্তি, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের ভাড়ায় যাতায়াত করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বাড়তি ভাড়া দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক যাত্রী।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনেও। পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজারে আসা ট্রাকগুলোর ভাড়া ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে।
একজন ট্রাকচালকের হিসাবে, পাবনা থেকে চট্টগ্রামে পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য যাওয়া-আসায় প্রায় ২২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় শুধু জ্বালানি খরচই এক ট্রিপে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রুটে ট্রাক মালিকেরা ইতিমধ্যে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন।
পরিবহন মালিকদের সংগঠনের নেতারাও জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রুটে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও এক ট্রিপে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
বেনাপোল থেকে ঢাকার কাঁচপুরে সাড়ে ১০ টন গার্মেন্টস পণ্য পরিবহনে আগে যেখানে ১৮-১৯ হাজার টাকা লাগত, এখন তা প্রায় ২২ হাজার টাকা হয়েছে। একইভাবে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় চাল পরিবহনের ভাড়াও ২০ হাজার থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে।
কনটেইনার পরিবহনেও খরচ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে গ্রাহকদের জানানো হয়েছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবহৃত কনটেইনার ডিপোগুলোতেও।
চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর বিভিন্ন সেবার ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। সোমবার থেকে এটি কার্যকর হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য, ডিপোগুলোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যানবাহনে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই অতিরিক্ত সারচার্জ নেওয়া হচ্ছে।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা না দিলেও ঢাকা-বরিশাল নৌপথে যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া বাড়িয়েছে মালিকদের সংগঠন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫০ টাকা হয়েছে। সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা, আর ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে।
লঞ্চ মালিকদের নির্ধারিত এই নতুন ভাড়া মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় দেশের মূল্যস্ফীতিও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, অথচ একই গতিতে আয় বাড়েনি।
এ অবস্থায় পরিবহন ব্যয় আরও বাড়লে এর প্রভাব শুধু যাত্রীদের যাতায়াত খরচে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পণ্য পরিবহন এবং পাইকারি ও খুচরা বাজারেও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়লে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য আরও কঠিন হয়ে দারিদ্র্যের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।