
ভারতে এখন থেকে শুধু খাদ্যপণ্য নয়, সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন প্রসাধনী ও নিত্যব্যবহার্য ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের ক্ষেত্রেও সেগুলো আমিষ না নিরামিষ—তা প্যাকেটে নির্দিষ্ট রঙের ফোঁটা দিয়ে জানাতে হবে। এ ধরনের পণ্যে প্রাণিজ উৎসের উপাদান থাকলে লাল বা বাদামি রঙের ফোঁটা এবং নিরামিষ উৎসের উপাদান থাকলে সবুজ রঙের ফোঁটা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ভারতের উপভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ভোক্তা বিষয়ক বিভাগ ‘লিগ্যাল মেট্রোলজি (প্যাকেজড কমোডিটিজ) ফোর্থ অ্যামেন্ডমেন্ট রুলস, ২০২৬’ জারি করে। সংশোধিত বিধি ওই দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে। এতে লিগ্যাল মেট্রোলজি (প্যাকেজড কমোডিটিজ) রুলস, ২০১১-এর ৬ নম্বর বিধিতে নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন বিধি অনুযায়ী, সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, অন্যান্য প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজের ক্ষেত্রে প্যাকেটের প্রধান প্রদর্শন অংশের ওপরের দিকে নির্দিষ্ট রঙের ফোঁটা রাখতে হবে। প্রাণিজ উৎসের পণ্য হলে লাল অথবা বাদামি ফোঁটা এবং নিরামিষ উৎসের পণ্য হলে সবুজ ফোঁটা দিতে হবে।
অর্থাৎ, কোনো ভোক্তা পণ্যের উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত তালিকা না পড়েও প্যাকেটের নির্দিষ্ট অংশে থাকা এই চিহ্ন দেখে সেটি তাঁর খাদ্যাভ্যাস বা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বুঝতে পারবেন।
কী বদলাল নতুন নিয়মে
ভারতে প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়কসংক্রান্ত বিভিন্ন বাধ্যতামূলক তথ্য নির্ধারণ করে লিগ্যাল মেট্রোলজি (প্যাকেজড কমোডিটিজ) রুলস, ২০১১। এর আওতায় প্রস্তুতকারক, প্যাকেটজাতকারী ও আমদানিকারকদের পণ্যের মোড়কে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, অন্যান্য প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজের জন্য আলাদা করে আমিষ–নিরামিষ উৎসের চিহ্নের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বিধিতে বলা হয়েছে, প্রাণিজ উৎসের পণ্যের ক্ষেত্রে লাল বা বাদামি রঙের ফোঁটা এবং নিরামিষ উৎসের পণ্যের ক্ষেত্রে সবুজ রঙের ফোঁটা প্যাকেটের ‘প্রিন্সিপাল ডিসপ্লে প্যানেল’-এর ওপরের দিকে রাখতে হবে। এই অংশটি সাধারণত প্যাকেটের এমন জায়গা, যা ভোক্তার কাছে সহজে দৃশ্যমান।
এর ফলে কোনো পণ্যে প্রাণিজ উৎসের উপাদান রয়েছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রে ভোক্তার জন্য একটি দৃশ্যমান সংকেত তৈরি হবে।
তবে নতুন বিধিটি সব ধরনের ভোগ্যপণ্যে প্রযোজ্য নয়। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্টভাবে সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, অন্যান্য প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজের কথা বলা হয়েছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পণ্যের মোড়কে এই চিহ্ন বাধ্যতামূলক হয়েছে—এমনটি বলা যাবে না।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে নতুন চিহ্ন বাধ্যতামূলক করার বিস্তারিত কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে মূলত সংশোধিত বিধির বিষয়বস্তু এবং তা কার্যকরের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ধরনের চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়টি ভারতে নতুন নয়। সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট ও অন্যান্য প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজের ক্ষেত্রে লাল, বাদামি ও সবুজ ফোঁটা ব্যবহারের বিধান আগে থেকেই লিগ্যাল মেট্রোলজি বিধিতে ছিল। নতুন সংশোধনীতে সেটি বিধি ৬-এর অন্য একটি উপবিধানে স্থানান্তর করে আবারও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের ৬(৮) উপবিধাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই বিধান নিয়ে অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই আইনি প্রশ্ন ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি হাইকোর্টে রেকিট বেনকিজার (ইন্ডিয়া) লিমিটেডের করা একটি মামলার শুনানিতে আদালত দেখতে পায়, প্রসাধনী ও অন্যান্য পণ্যে এই চিহ্ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অবস্থানের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে।
দিল্লি হাইকোর্টে কেন উঠেছিল প্রশ্ন
দিল্লি হাইকোর্টে চলমান ওই মামলায় প্রশ্ন ওঠে, সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট ও অন্যান্য প্রসাধনীতে আমিষ–নিরামিষের চিহ্ন ব্যবহারের বিধান নির্ধারণের এখতিয়ার লিগ্যাল মেট্রোলজি কর্তৃপক্ষের রয়েছে কি না।
আদালতের নথিতে দেখা যায়, বিষয়টি নিয়ে ড্রাগ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি বোর্ডের (DTAB) আগের আলোচনাও ছিল। বোর্ডের আলোচনায় বলা হয়েছিল, প্রসাধনীতে প্রাণিজ ও নিরামিষ উপাদান শনাক্ত করার জন্য একটি স্পষ্ট সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা নেই। সে কারণে বাধ্যতামূলক করার বদলে বিষয়টি স্বেচ্ছামূলক রাখার পক্ষেও মত দেওয়া হয়েছিল।
দিল্লি হাইকোর্ট তখন লিগ্যাল মেট্রোলজি ও ড্রাগ নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ, নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার আগে এ নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টি আদালতের নজরেও এসেছিল।
খাদ্য থেকে প্রসাধনী—কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
ভারতে খাবারের ক্ষেত্রে নিরামিষ ও আমিষ চিহ্নিত করার ব্যবস্থা বহুদিনের। ভোক্তা কোনো প্যাকেটজাত খাদ্য কিনতে গেলে সবুজ বা বাদামি/লাল চিহ্ন দেখে সেটি নিরামিষ না আমিষ, তা বুঝতে পারেন।
নতুন বিধানের বিশেষত্ব হলো, একই ধরনের ধারণা এখন খাবারের বাইরের কিছু পণ্যের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কারণ সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট বা প্রসাধনীর ক্ষেত্রে কোনো পণ্যের নাম বা বিজ্ঞাপন দেখে সব সময় বোঝা যায় না, এর উপাদানগুলোর উৎস কী। কিছু ভোক্তা ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত নীতি বা প্রাণিজ উপাদান এড়িয়ে চলার কারণে এসব তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
নতুন চিহ্ন সেই তথ্যকে প্যাকেটের দৃশ্যমান অংশে নিয়ে আসবে।
ভারতে নিরামিষভোজী কতজন
ভারতে নিরামিষভোজিতা নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশ হিন্দু। তবে হিন্দু হওয়া আর নিরামিষভোজী হওয়া এক বিষয় নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ অনুযায়ী, ভারতের ৪৪ শতাংশ হিন্দু নিজেদের নিরামিষভোজী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু নিজেদের নিরামিষভোজী বলে পরিচয় দেননি।
অঞ্চলভেদেও বড় পার্থক্য রয়েছে। পিউর জরিপে দেখা যায়, উত্তর ভারতে ৭১ শতাংশ, মধ্য ভারতে ৬১ শতাংশ এবং পশ্চিম ভারতে ৫৭ শতাংশ হিন্দু নিজেদের নিরামিষভোজী বলেছেন। বিপরীতে পূর্ব ভারতে এই হার ১৮ শতাংশ, উত্তর-পূর্ব ভারতে ১৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ ভারতে ৩০ শতাংশ।
তাই ভারতে হিন্দু এবং নিরামিষভোজী—এই দুই পরিচয়কে এক করে দেখা পরিসংখ্যানগতভাবে সঠিক নয়।
পশ্চিমবঙ্গেও খাবার নিয়ে বিতর্ক
ভারতে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গ। ২০২৬ সালে বিজেপি সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর কলকাতার স্কুলগুলোর মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচিতে ইসকনের মাধ্যমে রান্না করা নিরামিষ খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে এই উদ্যোগে ডিম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল ও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়।
পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ইসকনের রান্না করা নিরামিষ খাবারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে ডিমও দেওয়া হবে। আগস্ট থেকে কলকাতার বিভিন্ন স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।
অর্থাৎ, খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি এবং ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে যে বিতর্ক স্কুলের খাবারের মতো ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, তারই বিস্তৃত সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যে আমিষ–নিরামিষের চিহ্ন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
খাদ্যাভ্যাসের বাইরে নতুন পরিচয়
ভারতে নিরামিষভোজিতা শুধু খাবারের পছন্দের বিষয় নয়; অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এটি ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও ব্যক্তিগত নীতির সঙ্গেও যুক্ত। পিউর গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে ৩৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিজেদের নিরামিষভোজী হিসেবে পরিচয় দেন। আরও ৪২ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি নিরামিষভোজী না হলেও নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট ধরনের মাংস এড়িয়ে চলেন। সব মিলিয়ে ৮১ শতাংশ ভারতীয় কোনো না কোনোভাবে মাংস খাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন।
এই বাস্তবতায় নতুন বিধানের লক্ষ্য হলো ভোক্তার পছন্দের ক্ষেত্রে আরও দৃশ্যমান তথ্য দেওয়া। বিশেষ করে কোনো পণ্যে প্রাণিজ উৎসের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটি নিয়ে যাঁরা সচেতন, তাঁদের জন্য প্যাকেটের রঙের ফোঁটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে।
ফলে ভারতের বাজারে এখন থেকে কোনো সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট বা প্রসাধনীর প্যাকেট হাতে নিলে শুধু দাম, উপাদান, মেয়াদ ও প্রস্তুতকারকের তথ্য নয়—প্যাকেটের ওপরের দিকের রঙের ফোঁটার দিকেও নজর দিতে হবে। সবুজ ফোঁটা নিরামিষ উৎসের পণ্য নির্দেশ করবে; লাল বা বাদামি ফোঁটা নির্দেশ করবে অ-নিরামিষ বা প্রাণিজ উৎসের পণ্য।
খাদ্যপণ্যের গণ্ডি পেরিয়ে এই চিহ্ন এখন ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক হওয়ায় ভারতের ভোক্তা বাজারে আমিষ–নিরামিষ পরিচয়ের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হলো।