
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর সুযোগ রেখে একটি নতুন নিরাপত্তা চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেদেরিক নিলসেন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিটি কয়েক মাস ধরে চলা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর হলো। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এর জেরে ন্যাটোর দুই সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়। নতুন চুক্তিতে অবশ্য গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও স্বীকার করা হয়েছে।
তবে চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পিটুফিক স্পেস বেস আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষিণের নারসারসুয়াক ও পূর্বাঞ্চলের মেস্টারসভিগে নতুন ‘ডিফেন্স এরিয়া’ বা প্রতিরক্ষা এলাকা প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
নতুন চুক্তিটি ১৯৫১ সালের যুক্তরাষ্ট্র–ডেনমার্ক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সংশোধন ও সম্প্রসারণ করছে। এর সঙ্গে ২০০৪ সালের ইগালিকু চুক্তিসহ গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত পরবর্তী ব্যবস্থাগুলোকেও এর কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে।
চুক্তির মূল বিষয়গুলো হলো—
পিটুফিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ: গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক স্পেস বেসের কার্যক্রম আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
দুটি নতুন প্রতিরক্ষা এলাকা: দক্ষিণাঞ্চলের নারসারসুয়াক ও পূর্বাঞ্চলের মেস্টারসভিগে যুক্তরাষ্ট্র নতুন প্রতিরক্ষা এলাকা স্থাপন করতে পারবে। এসব এলাকার সুনির্দিষ্ট পরিধি, আকার ও কার্যক্রম দুই পক্ষের পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
ভবিষ্যতে আরও এলাকা: চুক্তিতে শুধু এই দুটি স্থানের কথা বলা হয়নি। প্রয়োজন হলে গ্রিনল্যান্ডে আরও প্রতিরক্ষা এলাকা স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো পক্ষ নতুন এলাকার প্রয়োজন মনে করলে তার অবস্থান, আয়তন, কার্যক্রমসহ বিস্তারিত প্রস্তাব দিতে পারবে।
ন্যাটোকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা: চুক্তিতে আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। ডেনমার্ককে আর্কটিক অঞ্চলে নজরদারি, স্থল, সমুদ্র, আকাশ ও মহাকাশ সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হলো—এতে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বরং ‘ডেনমার্ক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা’ এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন চুক্তিকে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেদেরিক নিলসেনও বলেছেন, চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের যৌথ নিরাপত্তায় গ্রিনল্যান্ডের ভূমিকার কথাও এতে স্বীকার করা হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব না পেলেও যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বীপটিতে সামরিক প্রবেশাধিকার ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুযোগ পাচ্ছে।
চুক্তির ভাষায়, উত্তর আটলান্টিক চুক্তি এলাকা, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি মার্কিন ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থাপনের কথাও চুক্তির ভূমিকায় উল্লেখ রয়েছে।
পিটুফিক স্পেস বেস যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও মহাকাশ স্থাপনা। নতুন চুক্তির ফলে এর পাশাপাশি নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার পথও তৈরি হলো।
ফলে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখনকার একটি ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পেল।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা এলাকার আশপাশের নিরাপত্তা।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিরক্ষা এলাকার আশপাশের ভূখণ্ড এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না, যাতে ওই এলাকার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। কোনো নির্মাণ বা স্থাপনার ব্যবহার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানাতে পারবে। এরপর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে।
এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতার কথাও রয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের সামরিক ও কৌশলগত আগ্রহ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি এবং উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দ্বীপটির অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ধারাগুলোর একটি হলো—গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হয়ে গেলেও চুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হবে না।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রটি ন্যাটোতে থাকবে। প্রয়োজনে স্বাধীনতার পর তাকে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে হবে।
একই সঙ্গে স্বাধীন গ্রিনল্যান্ডকে চুক্তির অধীনে ডেনমার্কের থাকা অধিকার ও দায়িত্বগুলো গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ, স্বাধীনতার পরও চুক্তির প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত কাঠামো অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গ্রিনল্যান্ডে স্বাধীনতার দাবি বহুদিনের। নতুন চুক্তিতে সেই সম্ভাবনাকে সরাসরি বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বা শেষ হওয়ার তারিখ নেই। অর্থাৎ এটি একটি স্থায়ী প্রকৃতির চুক্তি।
এতে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষের সম্মতি ছাড়া চুক্তিটি সংশোধন করা যাবে না। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার জন্য ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে জানানো হলে চুক্তি কার্যকর হবে।
চুক্তির পর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা স্বস্তির কথা বলেছেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, চুক্তির পর তাঁর দেশ আগের দিনের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এটি গ্রিনল্যান্ডে আরও শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনবে।
তবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেনের বক্তব্যে সতর্কতার সুরও রয়েছে। তিনি বলেছেন, চুক্তিটি ভালো দিকে এগোনোর একটি পদক্ষেপ হলেও দেশে ফিরে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে এবং সেটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে করতে হবে।
কারণ চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও চাপের কথা বলা হয়েছিল। ফলে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হলেও রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নটি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিশাল আয়তনের গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ এবং এর অবস্থান আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি এর অবস্থান সামরিক নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব শুধু সামরিক কারণে নয়। দ্বীপটিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলার ফলে নতুন সমুদ্রপথ ও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও ইউরোপের দেশগুলোর কাছেও আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।
নতুন চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সেই অঞ্চলে তার সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ পেল। অন্যদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড তাদের সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে।
গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ভিত্তি অবশ্য নতুন করে তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালের ইগালিকু চুক্তির মাধ্যমে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়।
নতুন চুক্তি সেই বিদ্যমান প্রতিরক্ষা কাঠামোকেই আরও বিস্তৃত করছে। ফলে এটিকে একেবারে নতুন কোনো সামরিক জোটের বদলে পুরোনো যুক্তরাষ্ট্র–ডেনমার্ক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যায়।
সব মিলিয়ে, নতুন চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা বদলানো হয়নি; ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বও বহাল থাকছে। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। পিটুফিক ঘাঁটির সম্প্রসারণ, নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে নতুন প্রতিরক্ষা এলাকা, গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হলেও চুক্তি বহাল রাখার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোয় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।