
অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে ‘গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং)’ কোর্সটির নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। আগামী ৫ অক্টোবর থেকে কোর্সটির জন্য নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী নেওয়া যাবে না। সরকারের অভিযোগ, কিছু শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্যের পরিবর্তে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান ও ভিসার শর্ত পূরণের উপায় হিসেবে কোর্সটি ব্যবহার করছে।
তবে সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে কোর্সটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে কয়েকটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা-অভিবাসন এজেন্টের তৎপরতা দেখা গেছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দ্রুত কোর্সটিতে ভর্তি হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোথাও কোর্স ফিতে ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৪৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং) কোর্সটি চালু রয়েছে। এতে ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি অন্য একটি কারিগরি বা বৃত্তিমূলক কোর্স শেষ করার পর এই ডিপ্লোমায় ভর্তি হওয়ার জন্য ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর নিবন্ধন রয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে।
বন্ধের আগে দ্রুত ভর্তি করানোর চেষ্টা
সরকার কোর্সটি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা-অভিবাসন খাতে তৎপরতা বেড়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু বিজ্ঞাপনে শিক্ষার্থীদের দ্রুত কোর্সটি শুরু করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। কোথাও ছাড়ের মাধ্যমে ভর্তি, আবার কোথাও বিনা মূল্যে ভর্তি-সংক্রান্ত সনদ দেওয়ার প্রস্তাবও প্রচার করা হয়েছে।
একটি বেসরকারি কলেজ অভিবাসন এজেন্টদের জন্য বিশেষ কমিশনের পাশাপাশি একই দিনে অফার লেটার ও ভর্তি নিশ্চিত করার প্রচার চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২১ সেপ্টেম্বর ও ২ অক্টোবর—দুটি ‘বিশেষ ভর্তি কার্যক্রমের’ তারিখও ঘোষণা করেছিল। দ্বিতীয় তারিখটি কোর্সটির আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে।
এ ধরনের তৎপরতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কোর্সটি বন্ধের দায়িত্বে থাকা সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল বলেছেন, সরকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত কোর্স শুরু করা বা নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর ধরন দেখা গেলে তা তদন্ত করা হবে এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
কেন কোর্সটি বন্ধ করছে সরকার
অস্ট্রেলিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে মূল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং কোর্স পরিবর্তনের প্রবণতা। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু শিক্ষার্থী অপেক্ষাকৃত উচ্চস্তরের পড়াশোনা থেকে নিচের স্তরের কোর্সে চলে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ এবং কাজের সুবিধা বজায় রাখার চেষ্টা করছিল।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্য কোর্স থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং)-এ শিক্ষার্থীদের স্থানান্তরের সংখ্যা ২০২০ সালের ৫১০ থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৪ হাজারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে কোর্সটিতে ভর্তির অনুমোদন পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক তখনও পড়াশোনা শুরু করেনি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার কোর্সটির ব্যবহার ও এর মাধ্যমে ভিসা ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সরকারের সাম্প্রতিক নীতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি কোর্সে ভর্তি হয়ে পরে অপেক্ষাকৃত নিম্নমূল্যের বা নিম্নস্তরের যোগ্যতার কোর্সে চলে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থী ভিসাকে প্রকৃত শিক্ষার পরিবর্তে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান ও কাজের সুযোগ ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমানো।
‘ভিসা হপিং’ ঠেকাতে আরও কড়াকড়ি
অস্ট্রেলিয়া সরকার সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কোর্স পরিবর্তন ও ভিসা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকে নতুন ভিসার প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী স্থানান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের কমিশন দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সরকারের দৃষ্টিতে এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো এমন একটি পরিস্থিতি ঠেকানো, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার কোর্সে ভর্তি হয়ে পরে অপেক্ষাকৃত কম মানের বা ভিন্ন ধরনের কোর্সে চলে যাবেন এবং এর মাধ্যমে তাঁর ভিসার মেয়াদ ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের সুযোগ বজায় রাখবেন।
শিক্ষার্থী ও এজেন্টদের ওপর চাপ
কোর্সটি বন্ধের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এমন শিক্ষার্থীরা, যাঁদের ভবিষ্যৎ ভর্তি নির্ধারিত ছিল কিন্তু এখনো কোর্স শুরু করেননি। ইতোমধ্যে কোর্সে পড়াশোনা শুরু করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবশ্য তাঁদের কোর্স শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাঁদের ভর্তি ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে বিকল্প উচ্চতর যোগ্যতার কোর্সে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এমন একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে, যিনি প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাচেলর ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে একজন অভিবাসন এজেন্টের পরামর্শে তিনি সেই পড়াশোনা ছেড়ে একটি কারিগরি কোর্সে ভর্তি হন এবং এরপর গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং) করার পরিকল্পনা করেন। কোর্সটি বন্ধের সিদ্ধান্তের পর তাঁকে দুটি কোর্স একই সময়ে করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এতে পড়াশোনার চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তাঁর মধ্যে।
অন্যদিকে, নিউ সাউথ ওয়েলসের মাইগ্রেশন ইনস্টিটিউট অব অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি মেলানি ম্যাকফারলেন বলেন, কিছু শিক্ষার্থীকে ভিসার শর্ত বজায় রাখতে একই প্রতিষ্ঠানের মাস্টার্স কোর্সে নেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, শিল্পের পরিবর্তিত নিয়মকানুনের কারণে কিছু অভিবাসন এজেন্টও আর্থিক চাপে পড়েছেন এবং তাঁদের কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের দ্রুত ওই ডিপ্লোমায় ভর্তি করানোর চেষ্টা করতে পারেন।
শিক্ষাব্যবস্থার মান ও ভিসা ব্যবস্থার অখণ্ডতা
ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার (আইইএএ) প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড কোর্সটি বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পরিচালিত কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর এ সিদ্ধান্ত আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন ব্যবস্থায় বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার একদিকে প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দেশটির উচ্চশিক্ষার সুযোগ বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার, অতিরিক্ত কোর্স পরিবর্তন এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত পড়াশোনার বাইরে অন্য উদ্দেশ্যে অবস্থান করার প্রবণতা ঠেকাতে নিয়ম কঠোর করছে।
গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং) কোর্সের ক্ষেত্রে ৫ অক্টোবরের পর নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তি বন্ধ হয়ে গেলেও আগে থেকেই পড়াশোনা শুরু করা শিক্ষার্থীরা কোর্সটি শেষ করতে পারবেন। ফলে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু এখনো পড়াশোনা শুরু করেননি, তাঁদের জন্য বিকল্প শিক্ষাগত ও ভিসা ব্যবস্থাপনা কী হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারের এই সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোর্সের মান, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত পড়াশোনার উদ্দেশ্য এবং ভিসা ব্যবস্থার অখণ্ডতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে এনেছে। কোর্স বন্ধের আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত ভর্তি করানোর প্রচেষ্টা সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।