
আল–জাজিরা
মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেলেন কোনো নারী। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ মঙ্গলবার ফাতিমা জাহরা আল মানসুরিকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হলেন। এর আগে তিউনিসিয়ার নাজলা বুদেন ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
৫০ বছর বয়সী ফাতিমা মানসুরি এর আগে মরক্কোর জাতীয় ভূমি পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন, আবাসন ও নগরনীতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশটির ঐতিহাসিক শহর মারাকেশের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। মঙ্গলবার রাজপ্রাসাদে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নিজের নিয়োগকে ‘সত্যিই ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন ফাতিমা। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, মরক্কোর ইতিহাসে এই প্রথম একজন নারী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটি শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়, দেশের সব নারীর জন্য গর্বের বিষয়।
নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব
গত সপ্তাহে মরক্কোয় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফল ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই ফাতিমা মানসুরিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হলো। তাঁর দল অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি—পিএএম—নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে।
দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন ৩৯৫টি। এর মধ্যে পিএএম পেয়েছে ৯৭টি আসন। তবে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৯৮টি আসন। ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে সরকার পরিচালনার জন্য একাধিক দলের সমন্বয়ে জোট গঠন করতে হবে।
মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের একজনকে রাজা সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই পিএএমের শীর্ষ নেতাদের একজন ফাতিমা মানসুরিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ জোট গঠন
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফাতিমা মানসুরির সামনে এখন সবচেয়ে তাৎক্ষণিক কাজ হলো একটি কার্যকর সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা। পিএএম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার পরিচালনায় তাদের অন্য দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে।
২০০৮ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফুয়াদ আলী আল হিম্মা পিএএম প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি নির্বাচনের পর অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে সব দল জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নয়।
জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) এবং ফেডারেশন অব ডেমোক্রেটিক লেফটসহ কয়েকটি দল বিরোধী দলে থাকার কথা জানিয়েছে। ফলে সরকার গঠনে ফাতিমাকে কোন কোন দলের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে হবে, সেটিই এখন মরক্কোর রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে সরকারপ্রধান
ফাতিমা জাহরা মানসুরি মরক্কোর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ২০০৯ সালে তিনি প্রথমবার মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে তিনি শহরটির প্রথম নারী মেয়র হওয়ার নজির গড়েন। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর আবারও তিনি মারাকেশের মেয়রের দায়িত্বে ফেরেন।
এর পাশাপাশি তিনি একাধিক মেয়াদে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২০২১ সালে জাতীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন এবং জাতীয় ভূমি পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন, আবাসন ও নগরনীতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ফাতিমা। ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায়িক আইনে উচ্চতর ডিপ্লোমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সন ব্যবসায়িক আইনে ডিপ্লোমা অর্জন করেছেন।
মারাকেশের মেয়র ও জাতীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার পর এবার তাঁর সামনে পুরো দেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এসেছে।
২০৩০ বিশ্বকাপের বিশাল বিনিয়োগ
নতুন সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব হবে ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি। মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল যৌথভাবে ওই বিশ্বকাপ আয়োজন করবে।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দেশটির অবকাঠামো, পরিবহন, পর্যটন, ক্রীড়া স্থাপনা ও অন্যান্য খাতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সরকারকে এসব বিনিয়োগের অগ্রাধিকার ও বণ্টন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রয়টার্সের হিসাবে, বিশ্বকাপের প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে মরক্কোয় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কার্যক্রম রয়েছে।
ফলে ফাতিমার সরকারকে একদিকে জোট গঠনের রাজনৈতিক সমীকরণ সামলাতে হবে, অন্যদিকে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানও বড় ইস্যু
নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক চাপও রয়েছে। কর্মসংস্থান, মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরি করা মরক্কোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৩৮ শতাংশের মতো ছিল, যা রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের আমলে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
নতুন সরকারকে তাই শুধু প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নাগরিকদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক উদ্বেগেরও মোকাবিলা করতে হবে। ফাতিমা নিজেও বলেছেন, নতুন সময়টি মরক্কোর নাগরিকদের, বিশেষ করে তরুণদের উচ্চ প্রত্যাশার সময়।
আরব বিশ্বে দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান
ফাতিমা জাহরা মানসুরির নিয়োগ মরক্কোর জন্য যেমন প্রথম, তেমনি আরব বিশ্বের ক্ষেত্রেও এটি একটি বিরল ঘটনা। তিনি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হলেন।
তিউনিসিয়ার নাজলা বুদেন ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর পর এবার ফাতিমা মানসুরি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিলেন।
মরক্কোর নতুন সরকার গঠনের পাশাপাশি তাঁর এই নিয়োগ দেশটির নারী নেতৃত্ব ও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নতুন একটি অধ্যায় তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্বের পাশাপাশি এখন তাঁর সামনে রয়েছে জোট গঠন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ২০৩০ বিশ্বকাপের মতো বড় জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তব দায়িত্ব।