
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর তেহরানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু সেখানেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা হলে তাঁকে হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়—এমন দাবি করেছেন ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য ধর্মীয় নেতা মহসেন হেইদারি।
কাতারের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল আরাবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেইদারি বলেন, প্রথম হামলায় আহত হওয়ার পর মোজতবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরে তেহরানের তিনটি হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে তৃতীয় হাসপাতালটিতে মোজতবা চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং হামলার পর তাঁকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের করে আনা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
হেইদারির এই বক্তব্যের স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে মোজতবার শারীরিক অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা তথ্য ও জল্পনা রয়েছে।
প্রথম হামলার পর হাসপাতালে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির তেহরানের বাসভবন লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় বলে ইরানি কর্মকর্তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। ওই হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আলী খামেনি এবং দেশটির আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
মোজতবা খামেনিও ওই হামলায় আহত হন বলে হেইদারি জানিয়েছেন। এরপর তাঁকে চিকিৎসার জন্য তেহরানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও তিনি নিরাপদে থাকতে পারেননি বলে দাবি করেছেন এই ধর্মীয় নেতা।
হেইদারি বলেন, মোজতবা আহত হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তেহরানের তিনটি হাসপাতাল পরপর হামলার শিকার হয়। তৃতীয় হাসপাতালেই মোজতবা ছিলেন এবং সেখান থেকে তাঁকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।
এরপর থেকেই আড়ালে মোজতবা
হাসপাতাল থেকে উদ্ধারের পর মোজতবা খামেনিকে অজ্ঞাত একটি স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে হেইদারির বক্তব্যে জানা গেছে। এরপর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
তাঁর অবস্থান ও শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাতে কিছু প্রতিবেদনে তাঁর গুরুতর আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক সময়ে মোজতবার সুস্থতার কথা বলেছেন। ফলে তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
হেইদারি অবশ্য বলেছেন, মোজতবা নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন—এমন তথ্য তাঁরা পেয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় যোগ্যতা, ন্যায়বিচার এবং দেশ পরিচালনার সক্ষমতার প্রয়োজনীয় শর্তগুলোও তাঁর মধ্যে রয়েছে বলে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যরা মনে করেছিলেন।
নির্বাচনের খবরও জানতেন না মোজতবা
মোজতবাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচনের প্রক্রিয়াটিও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছেন হেইদারি।
তাঁর দাবি, ৮ মার্চ মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সময় তিনি নিজেই এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নির্বাচনের ঘোষণা সম্প্রচারিত হওয়ার পরই তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।
হেইদারির ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর মোজতবার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি ‘আইনগত ও ধর্মীয়ভাবে’ বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।
বোমা হামলার মুখে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক দায়িত্ব অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের। মোজতবার নির্বাচন প্রক্রিয়ার সময় এই পরিষদও নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে ছিল বলে হেইদারি জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিষদের কোম শহরের সচিবালয়েও হামলা চালানো হয়। এতে আটজন নিহত হন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তৈরি করা কিছু নথি ও সুপারিশ ধ্বংস হয়ে যায়।
এরপর হামলার প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে পরিষদের সদস্যদের একটি গোপন স্থানে বৈঠকের জন্য ডাকা হয়। হেইদারির বর্ণনা অনুযায়ী, সদস্যদের আগে বৈঠকের স্থান বা আলোচনার বিষয় জানানো হয়নি।
এমনকি বৈঠকে যাওয়ার আগেই সদস্যরা কাগজে তাঁদের পছন্দের ব্যক্তির নাম লিখে রেখেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
প্রথমে মোজতবার নাম প্রস্তাব করেন হেইদারি
হেইদারির দাবি, ওই বৈঠকে মোজতবা খামেনির নাম প্রথম তিনিই প্রস্তাব করেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আলী খামেনির ছেলেকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেইদারি বলেন, ওই পরিস্থিতিতে শত্রুপক্ষের অবস্থান বিবেচনা করেই তাঁরা মোজতবার নাম সামনে আনেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা এমন তথ্য পেয়েছিলেন যে মোজতবা সুস্থ আছেন এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন।
হেইদারি আরও দাবি করেন, দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ধর্মীয় যোগ্যতা, ন্যায়বিচার ও সক্ষমতার শর্তগুলো মোজতবার মধ্যে রয়েছে বলে পরিষদের সদস্যরা নিশ্চিত হয়েছিলেন।
৫৯ ভোটের মধ্যে ৫০টি মোজতবার পক্ষে
গোপন ভোটে মোজতবা খামেনি ৫৯টি ভোটের মধ্যে ৫০টি পান বলে হেইদারি জানিয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি পান আটটি ভোট। একজন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
এই ভোটের মধ্য দিয়ে মোজতবা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।
মোজতবার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে হেইদারি আরও দাবি করেন, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যরা তাঁর নির্বাচনের আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শ করেননি।
‘ছায়ার আড়ালে থাকা’ নেতা
আলী খামেনির জীবদ্দশায় মোজতবা খামেনি ইরানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদে ছিলেন না বলে হেইদারি জানিয়েছেন। তবে তিনি তাঁর বাবার উপদেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেইদারি তাঁকে ‘ছায়ার আড়ালে থাকা মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা সীমিত থাকলেও ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর অভ্যন্তরে তাঁর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ছিল।
বৈঠকও হচ্ছে গোপনে
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে মোজতবা খামেনি ও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যদের মধ্যে বড় পরিসরে বৈঠক হয়নি বলেও হেইদারি জানিয়েছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মোজতবা এবং পরিষদের সদস্যরা এখনো নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাই বড় কোনো সভার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা গোপন বৈঠকের মাধ্যমে কাজ চালানো হচ্ছে।
ফলে মোজতবার নেতৃত্বের শুরুটিও অন্য অনেক দেশের সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের মতো প্রকাশ্য কর্মসূচি ও নিয়মিত জনসম্মুখে উপস্থিতির মধ্য দিয়ে হয়নি। বরং যুদ্ধ, হামলা এবং নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে আড়ালেই তাঁর নেতৃত্বের প্রথম কয়েক মাস কেটেছে।
মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
মোজতবা খামেনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে এখনো পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। কিছু মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাতে তাঁর গুরুতর আহত হওয়ার খবর এসেছে। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে দাবি করেছেন।
এর মধ্যে হেইদারির নতুন বক্তব্যে জানা গেল, প্রথম হামলায় আহত হওয়ার পর মোজতবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে সেই হাসপাতালও হামলার শিকার হয়। তাঁর দাবি সত্য হলে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগে মোজতবা খামেনি অন্তত দুবার হামলার মুখে পড়েছিলেন।
তবে হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপ থেকে তাঁকে উদ্ধারের এই বর্ণনা এখন পর্যন্ত মূলত হেইদারির বক্তব্যের ওপরই নির্ভর করছে। তাই মোজতবার বর্তমান অবস্থান ও শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে আরও স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।