
ভারতের চলচ্চিত্র জগতের বর্ষীয়ান নির্মাতা সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাও আর নেই। শনিবার রাতে চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। বেশ কিছুদিন ধরে বয়সজনিত নানা জটিলতায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এই নির্মাতা।
তেলুগু চলচ্চিত্রে ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন সিঙ্গীতম। বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, ফ্যান্টাসি, কমেডি, সামাজিক গল্প কিংবা জীবনীভিত্তিক সিনেমা—কোনো একটি ঘরানার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে বিভিন্ন ভাষায় ৬০টিরও বেশি সিনেমা নির্মাণ করেছেন।
১৯৩১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশের গুদুরে জন্মগ্রহণ করেন সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাও। চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু কিংবদন্তি নির্মাতা কে ভি রেড্ডির সহকারী হিসেবে। ‘মায়াবাজার’ ও ‘জগদেকা ভীরুনি কথা’র মতো আলোচিত সিনেমার নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
সেই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর নিজস্ব নির্মাণশৈলী গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৭২ সালে ‘নীতি নিজায়িতি’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ধারাবাহিকভাবে ভিন্নধর্মী গল্প ও নির্মাণের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
১৯৭৪ সালে ‘দিক্কাত্র পার্বতী’ নির্মাণ করেন সিঙ্গীতম। সিনেমাটি তামিল ভাষার সেরা ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এরপর ১৯৭৭ সালের ‘থারাম মারিন্দি’ তাঁকে এনে দেয় নান্দী পুরস্কার।
তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘ময়ুরি’ মুক্তি পায় ১৯৮৫ সালে। ভারতীয় নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী সুধা চন্দ্রনের জীবন অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে তিনিই অভিনয় করেন। দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসার পাশাপাশি সিনেমাটি একাধিক পুরস্কারও পায়। পরে হিন্দি ভাষায় ‘নাচে ময়ুরি’ নামে ছবিটির পুনর্নির্মাণ হয়।
সিঙ্গীতমের সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলোর একটি ১৯৮৭ সালের ‘পুষ্পক বিমানম’। কমল হাসান ও অমলা অভিনীত এই সিনেমার বিশেষত্ব ছিল—প্রচলিত অর্থে এতে কোনো সংলাপ ছিল না।
কথোপকথনের পরিবর্তে শব্দ, অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও পরিস্থিতির মাধ্যমে দর্শকের সামনে গল্প তুলে ধরেছিলেন নির্মাতা। ব্যতিক্রমী এই নির্মাণ পরবর্তীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা জনপ্রিয় বিনোদনমূলক ছবির স্বীকৃতি পায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে পরীক্ষামূলক নির্মাণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে সিনেমাটি আজও আলোচিত।
সিঙ্গীতমের চলচ্চিত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিলেন অভিনেতা কমল হাসান। ‘সোম্মোকাদিদি সোকোকাদিদি’, ‘রাজা পারভাই’, ‘পুষ্পক বিমানম’ এবং ‘মাইকেল মাদানা কামা রাজন’-এর মতো সিনেমায় তাঁদের যৌথ কাজ দর্শকদের বিশেষভাবে মনে রেখেছে।
কমল হাসানের অভিনয়ক্ষমতাকে ভিন্ন ধরনের চরিত্র ও পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সিঙ্গীতমের আলাদা দক্ষতা ছিল। তাঁদের সিনেমায় কমেডি, ব্যঙ্গ, মেকআপ, শারীরিক অভিনয় এবং গল্প বলার নানা নতুন পদ্ধতির পরীক্ষা দেখা গেছে।
১৯৯১ সালের ‘আদিত্য ৩৬৯’ সিঙ্গীতমের উচ্চাভিলাষী কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। নন্দমুরি বালকৃষ্ণ অভিনীত সিনেমাটিতে সময়ভ্রমণের কাহিনি তুলে ধরা হয়। তেলুগু চলচ্চিত্রে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে এখনো সিনেমাটির নাম উল্লেখ করা হয়।
এরপর ‘ভৈরব দ্বীপম’-এ লোককথা, পুরাণ, অ্যাডভেঞ্চার ও ফ্যান্টাসিকে একসঙ্গে মিলিয়ে নতুন এক জগৎ তৈরি করেন তিনি। বালকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর আরও কয়েকটি কাজও দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।
শুধু তেলুগু নয়, কন্নড়, তামিল, হিন্দিসহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় কাজ করেছেন সিঙ্গীতম। কন্নড়ের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজকুমারের সঙ্গেও তাঁর সফল সহযোগিতা ছিল।
রাজকুমারের সঙ্গে ‘হালু জেনু’, ‘চালিসুভা মোদাগালু’, ‘এর্দু নক্ষত্রাগালু’ ও ‘ভাগ্যদা লক্ষ্মী বারাম্মা’র মতো সিনেমা নির্মাণ করেন তিনি। রাজকুমারের দুই ছেলে শিবরাজকুমার ও রাঘবেন্দ্র রাজকুমারের চলচ্চিত্রজীবনের শুরুর সময়েও তাঁর ভূমিকা ছিল।
চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক নান্দী পুরস্কার, কর্ণাটক স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড দক্ষিণ পেয়েছেন সিঙ্গীতম।
২০১১ সালে ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। পরের বছর তাঁর ঝুলিতে যোগ হয় বি এন রেড্ডি জাতীয় পুরস্কার।
তবে পুরস্কারের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল বৈচিত্র্যময় নির্মাতা হিসেবে। একই ধরনের গল্প বা নির্মাণশৈলী বারবার ব্যবহার না করে প্রতিটি সিনেমায় নতুন কিছু করার চেষ্টা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বয়স বাড়লেও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ হারাননি সিঙ্গীতম। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে আবার পরিচালনায় ফেরেন তিনি। নবীন নির্মাতা নাগ অশ্বিনের প্রযোজনায় নিজের ৬১তম সিনেমা ‘সিং গীতম’ নির্মাণ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে মনে লালন করা একটি গল্প শেষ বয়সে এসে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন এই কিংবদন্তি নির্মাতা। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারাল এমন একজন স্রষ্টাকে, যিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বারবার নতুনভাবে সিনেমা ভাবতে শিখিয়েছেন।