
পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা’ বা ‘বেঙ্গল’ করার পুরোনো উদ্যোগ থেকে সরে এসে রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য বিজেপি। এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনে একটি বিল আনা হবে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
সোমবার সল্টলেকে বিজেপির দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, রাজ্যের নাম বাংলা, পশ্চিম বাংলা, বেঙ্গল, বঙ্গাল কিংবা ওয়েস্ট বেঙ্গল—কোনোটিই হবে না। রাজ্যের নাম বাংলায় যেমন ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থাকবে, ইংরেজিতেও একই নাম রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিধানসভায় বিল, এরপর কেন্দ্রের অনুমোদন
শমীক ভট্টাচার্য জানান, রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনে একটি বিল পেশ করা হবে। বিধানসভায় বিলটি অনুমোদিত হলে তা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
এরপর প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পরই নাম পরিবর্তনের বিষয়টি আইনি রূপ পাবে।
অর্থাৎ, রাজ্য বিধানসভায় বিল পাস হলেই নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির মধ্য দিয়ে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
‘বাংলা’ নামের প্রস্তাব ঝুলে ছিল
পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় রাজ্যের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নতুন করে সামনে আসে।
ওই বছরের ২ আগস্ট রাজ্য মন্ত্রিসভায় একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সেখানে বাংলায় রাজ্যের নাম ‘বাংলা’, ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ এবং হিন্দিতে ‘বঙ্গাল’ করার প্রস্তাব ছিল।
পরে ২০১৮ সালে রাজ্য বিধানসভায় রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার জন্য একটি প্রস্তাব পাস করে তা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে কেন্দ্রীয় সরকার ওই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। ফলে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে ছিল।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের জন্য ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের কাছেও অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ‘বাংলা’ নামের প্রস্তাব নিয়ে কেন্দ্রের সম্মতি পাওয়া যায়নি।
১৯৯৯ সালেও নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব
পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ আরও পুরোনো। ১৯৯৯ সালের ২০ জুলাই রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সব ভাষাতেই রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ করা হোক।
পরে সেই আলোচনা থেকে রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার প্রস্তাব সামনে আসে। তবে সেটিও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি।
এরপর ২০১৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি আবার সক্রিয়ভাবে আলোচনায় আসে। সে সময় বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নাম রাখার প্রস্তাব দেওয়া হলেও কেন্দ্রীয় অনুমোদনের অভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি।
ইংরেজিতেও ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার যুক্তি
এবার রাজ্যের নাম ইংরেজিতেও ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে ইংরেজিতে রাজ্যের নাম ‘West Bengal’ হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বৈঠক ও আনুষ্ঠানিক তালিকায় রাজ্যটির নাম ইংরেজি বর্ণমালার ‘W’ অক্ষর অনুযায়ী থাকে।
ইংরেজি বর্ণমালার শেষের দিকে ‘W’ থাকার কারণে বিভিন্ন বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের নাম তুলনামূলকভাবে শেষের দিকে আসে বলে দাবি করেন তিনি।
এই যুক্তি থেকেই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিজেপির রাজ্য সভাপতি।
‘বাংলা’ নয়, ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার অবস্থান
সংবাদ সম্মেলনে শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করে বলেন, রাজ্যের নাম বাংলা, পশ্চিম বাংলা, বেঙ্গল, বঙ্গাল বা ওয়েস্ট বেঙ্গল কোনোটিই হবে না। তাঁর মতে, বাংলায় রাজ্যের প্রচলিত নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ এবং ইংরেজিতেও সেই নাম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বিধানসভায় বিল আনার মাধ্যমে নতুন প্রক্রিয়া শুরু হবে। রাজ্য বিধানসভায় অনুমোদনের পর তা কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হবে এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়া হবে।
কেন্দ্রের অনুমোদনই চূড়ান্ত ধাপ
ভারতের কোনো রাজ্যের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাজ্য বিধানসভার প্রস্তাবের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ‘বাংলা’ নাম করার প্রস্তাব রাজ্য বিধানসভায় অনুমোদিত হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তা অনুমোদন না পাওয়ায় উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি। এবার ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম রাখার প্রস্তাব বিধানসভায় পাস হলে সেটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যাবে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের বিতর্ক নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনে বিলটি পেশ হওয়ার পরই এ বিষয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে।