
রয়টার্স
আবাসনসংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং পার্লামেন্টে সরকারের একাধিক আবাসনসংক্রান্ত উদ্যোগ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর রাজনৈতিক চাপের মুখে স্পেনে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। আগামী ২৯ নভেম্বর দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সোমবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে সানচেজ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তাঁর সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, বিভিন্ন জনমত জরিপে তাঁর নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট পার্টি প্রধান বিরোধী দল পপুলার পার্টির (পিপি) চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অতি ডানপন্থী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। প্রচলিত মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ভোটারদের একাংশের আগ্রহ কমে যাওয়ার এই সময়ে নির্বাচনে সানচেজের পরাজয় হলে তা ইউরোপের হাতে গোনা কয়েকটি বামঘেঁষা সরকারের একটি পতনের পথ তৈরি করতে পারে।
তবে সানচেজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর একাধিক নজির রয়েছে। ফলে জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও আগাম নির্বাচনকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবেও দেখছেন তিনি।
আবাসনসংকট কেন বড় রাজনৈতিক ইস্যু
স্পেনে সাম্প্রতিক সময়ে আবাসনসংকট সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বাড়ি কেনার পাশাপাশি ভাড়া বাড়ির ব্যয়ও বেড়েছে। এর ফলে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
আবাসনসংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। বাড়ির দাম ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং আবাসনকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার দাবিতে এসব বিক্ষোভে মানুষ অংশ নিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে সানচেজ সরকার আবাসনসংক্রান্ত একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করলেও পার্লামেন্টে তাঁর সরকারের কয়েকটি অধ্যাদেশ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে সরকারের আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়।
রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আবাসনসংকটকে কেন্দ্র করে সরকারের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ছিল। এমন পরিস্থিতিতে পার্লামেন্টে নিজের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি ভোটারদের কাছ থেকে নতুন ম্যান্ডেট নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন সানচেজ।
কেন এখনই আগাম ভোট
স্পেনে নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত সানচেজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর সোশ্যালিস্ট পার্টি বর্তমানে অধিকাংশ জনমত জরিপে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে আগাম নির্বাচন ডাকলে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে অন্যদিকে পার্লামেন্টে সরকারের আইন পাস করাতে সমস্যা হওয়া এবং আবাসনসংকটসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় মেয়াদ পূর্ণ করে ক্ষমতায় থাকা সানচেজের জন্যও কঠিন হয়ে উঠছিল।
এই পরিস্থিতিতে আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে নতুন সমর্থন নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য হলো নির্বাচনের পর পার্লামেন্টে প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা।
টেলিভিশন ভাষণে সানচেজ বলেন, ‘জনগণের সমর্থন আমাদের নতুন করে নেওয়া প্রয়োজন। পার্লামেন্টে প্রগতিশীলদের বড় আকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে আমাদের জনগণকে সংগঠিত এবং জয়ী হতে হবে। এতে নতুন সামাজিক অগ্রগতি আসতে পারে এবং স্পেনের রূপান্তর অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে।’
নিজের ভুল ও ব্যর্থতা স্বীকার
সানচেজ তাঁর সরকারের কিছু ভুল এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার কথাও স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষের বিষয়টি উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি, সামাজিক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের একটি অংশ আজ অসন্তুষ্ট।’
তবে একই সঙ্গে তিনি স্পেনের উদারনৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত দায়িত্বশীলতা রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এসব মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে তাঁর সরকার দেশটির রূপান্তরের কাজ অব্যাহত রাখতে চায় বলে জানান তিনি।
সানচেজের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আগাম নির্বাচনকে তিনি শুধু সরকারের বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসেবে দেখছেন না; বরং নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষে নতুন করে জনসমর্থন আদায়ের সুযোগ হিসেবেও দেখছেন।
বিরোধীদের দীর্ঘদিনের দাবি
আগাম নির্বাচনের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল পপুলার পার্টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দলটি মাত্র একটি শব্দে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে—‘অবশেষ’।
রক্ষণশীল পিপি দীর্ঘদিন ধরেই সানচেজকে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। সরকারের বিভিন্ন নীতি, আবাসনসংকট এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সানচেজের সমস্যাকে সামনে রেখে বিরোধীরা তাঁর সরকারের সমালোচনা করে আসছিল।
এখন আগাম নির্বাচনের ঘোষণা বিরোধী পিপির জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করেছে। জনমত জরিপে দলটি এগিয়ে থাকায় তারা ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে নামতে পারে।
ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ
সানচেজের আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ছে এবং অতি ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো ইস্যুগুলো অনেক দেশের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্পেনও এই বৃহত্তর ইউরোপীয় রাজনৈতিক প্রবণতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; দেশটির রাজনৈতিক ভারসাম্য কোন দিকে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
সানচেজের সোশ্যালিস্ট পার্টি যদি নির্বাচনে ভালো ফল করে এবং প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়ে কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন করতে পারে, তাহলে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবেন। বিপরীতে বিরোধী পিপি এগিয়ে গেলে স্পেনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সানচেজের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
আগাম নির্বাচন ডাকার সিদ্ধান্ত তাই সানচেজের জন্য একই সঙ্গে ঝুঁকি ও সুযোগ—দুই-ই তৈরি করেছে। একদিকে জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকা এবং আবাসনসংকট নিয়ে জনঅসন্তোষ তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে পার্লামেন্টে নীতিগত উদ্যোগ আটকে যাওয়া থেকে বেরিয়ে এসে নতুন জনসমর্থন নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়ানোর নজির থাকা সানচেজ এবারও সেই কৌশল কাজে লাগাতে চাইছেন। তবে ২৯ নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটাররা তাঁর সরকার ও সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রতি কতটা আস্থা রাখছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে স্পেনের পরবর্তী রাজনৈতিক পথ।