
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণদের পাশে থাকার ঘোষণা | আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লিতে আন্দোলনরত তরুণ ও গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ভারতের আন্দোলনকারীদের সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। গণতান্ত্রিক অধিকার, জবাবদিহি ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁদের পাশে রয়েছে বাংলাদেশ।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই লড়াই শুধু আপনাদের একার নয়। ঢাকা থেকে আমরা আপনাদের পাশে আছি।’
শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইংরেজিতে লেখা ‘ভারতের তরুণদের প্রতি সংহতি বিবৃতি’ প্রকাশ করেন তিনি। বিবৃতিতে ভারতের তরুণ, আন্দোলনকারী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর প্রতি সংহতি জানানোর পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ এবং যন্তর মন্তরে বিধিনিষেধ আরোপের সমালোচনা করেন নাহিদ।
নির্বাচনী জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের স্বচ্ছ জবাব দিতে হবে। এসব উদ্বেগ মোকাবিলায় ব্যারিকেড কিংবা তথ্যপ্রবাহে বাধা দেওয়া সমাধান হতে পারে না।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগঠক নাহিদ ইসলাম বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন। বিবৃতিতে তিনি বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভারতের চলমান আন্দোলনের যোগসূত্র তুলে ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।
‘আমরাও এর মধ্য দিয়ে গিয়েছি’
ভারতের আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক ক্ষমতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি দুই দেশের মানুষের সংগ্রামকে একসূত্রে যুক্ত করেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জবাবদিহিমূলক ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মানবিক মর্যাদার অভিন্ন দাবিতে বন্ধনে আবদ্ধ বন্ধু হিসেবে ঢাকা থেকে আমরা আপনাদের পাশে আছি। এই লড়াইকে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি। কারণ, আমরাও এর মধ্য দিয়ে গিয়েছি।’
বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ভারতের নাগরিক সমাজের একাংশের সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নাহিদ বলেন, ওই সময়ে ভারতীয় শিক্ষার্থী, লেখক ও স্বাধীনচেতা কণ্ঠস্বরগুলোর পক্ষ থেকে যে সংহতি জানানো হয়েছিল, তা তাঁরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের পারস্পরিক সংহতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নাহিদের মতে, গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ ধরনের সংগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের অভিন্ন ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সমালোচনা
বিবৃতিতে হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, ফ্যাসিবাদ এবং ধর্মীয় আধিপত্যের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, এসব প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। বাংলাদেশের মতো ভারতেও কর্তৃত্ববাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বিরোধিতা করেন তাঁরা।
তিনি বলেন, ধর্ম, জাতপাত, লিঙ্গ কিংবা শ্রেণিনির্বিশেষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।
নাহিদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সমাজে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ভয়ের মধ্যে বসবাস করতে হলে, ভিন্নমত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের অধিকার নির্ধারিত হলে সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক বলা যায় না।
বিবৃতিতে তিনি গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর আহ্বান, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য যেন মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দাবি
নয়াদিল্লিতে আন্দোলন ঘিরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী, সংগঠক ও সাংবাদিকদের আটক করার অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে সম্মান জানাতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আন্দোলনের সংগঠকদের কোথায় রাখা হয়েছে এবং কী আইনি ভিত্তিতে তাঁদের আটক করা হয়েছে, তা প্রকাশের দাবি জানান নাহিদ। গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার কারণে যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিকেরা যাতে ভয়ভীতি কিংবা তাঁদের সরঞ্জাম জব্দের আশঙ্কা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ এবং যন্তর মন্তরে বিধিনিষেধ আরোপেরও সমালোচনা করা হয়। নাহিদের মতে, এসব পদক্ষেপ মৌলিক স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর জবাব স্বচ্ছতার সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, গণতান্ত্রিক সংকট বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের জবাব দিতে হলে নাগরিকদের মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার রক্ষা করতে হবে। আন্দোলনকারীদের কণ্ঠরোধ না করে তাঁদের উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রশ্নের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ-ভারতের অমীমাংসিত বিষয়ও তুলে ধরলেন নাহিদ
ভারতের আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অমীমাংসিত বিষয়গুলোও বিবৃতিতে তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দুই দেশের মানুষের সংগ্রাম পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানি বণ্টন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো প্রশ্নও এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নাহিদের বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্ককে কেবল কূটনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আলোকে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পাশাপাশি সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ, পানির ন্যায্য বণ্টন, পরিবেশ রক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়েও ন্যায়সংগত সমাধান প্রয়োজন।
বিবৃতিতে তিনি এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশের মানুষের অভিন্ন স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এসব বিষয়ও যুক্ত।
‘দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ বিভাজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না’
বিবৃতির শেষাংশে ভারতের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে এবং জুলাই প্রজন্মের অপূর্ণ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে, আমরা আপনাদের পাশে আছি।’
আন্দোলনকারীদের অবিচল থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি পারস্পরিক সহযোগিতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর আহ্বান, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎকে ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না; বরং গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।
নাহিদের এই বিবৃতিতে ভারতের আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা উঠে এসেছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবির মধ্য দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আঞ্চলিক সংহতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।