
রয়টার্স
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি শাসন জারির পর কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শত শত নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী ও ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সোহেল আফ্রিদি এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য। ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সমর্থকদের ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার পরিকল্পনার মধ্যে এই ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটল।
গত রোববার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে স্থগিত করা হয় প্রাদেশিক সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদি।
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে প্রাদেশিক সরকার। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জরুরি শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
তবে এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে পিটিআই। দলটির অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সমর্থকেরা যাতে ইসলামাবাদে গিয়ে বিক্ষোভ করতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যেই জরুরি শাসন জারি এবং ধরপাকড় চালানো হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নেওয়া সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের কারও বিরুদ্ধে বিচারযোগ্য মামলা পাওয়া গেলে অভিযোগ গঠন করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে এমন মামলা পাওয়া যাবে না, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
তালাল চৌধুরী বলেন, রোববার প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন থেকে তাঁদের আটক করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে রেখেছেন। বিভিন্ন স্থানে শিপিং কনটেইনার বসিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের ফলে প্রদেশটির গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ইমরান খানের সহযোগী ও পিটিআই নেতা শওকত ইউসুফজাই ধরপাকড়ের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি আটক রাজনীতিকদের মুক্তি দাবি করেছেন। পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে এই অভিযানকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জরুরি শাসন জারির আগের সপ্তাহ থেকেই খাইবার পাখতুনখাওয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইমরান খানের সমর্থকেরা কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ করছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল ইসলামাবাদে গিয়ে ইমরানের মুক্তি ও চিকিৎসার দাবিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
পদযাত্রার পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীসহ দলটির নেতা-কর্মীদের আটকের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
পদযাত্রা শুরুর আগেই ইমরান খানের তিন বোন এবং তাঁর কয়েক শ সমর্থককে আটক করা হয়েছিল। এসব ঘটনার পর বিরোধী দলটির কর্মসূচি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের মুক্তির দাবি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তাঁর সমর্থকেরা নিয়মিত বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সহিংসতার আশঙ্কাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি শাসন জারি এবং প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার ঘটনায় ইমরান খানের সঙ্গে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৭৪ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান বর্তমানে কারাবন্দী। তাঁর দল পিটিআইয়ের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিকভাবে দলটিকে চাপে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, প্রদেশটির অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। গত কয়েক মাসে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র হামলার ঘটনা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, এসব হামলা নিয়ন্ত্রণে পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তবে পিটিআই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ পরিস্থিতিতে জরুরি শাসন জারির সিদ্ধান্তকে সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করছে। বিপরীতে পিটিআইয়ের দাবি, পদক্ষেপটির মূল উদ্দেশ্য তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা। দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে প্রদেশটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা জারির পর কেন্দ্রীয় সরকার কোনো প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে পারে। দেশটির আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর প্রদেশের দায়িত্ব গভর্নর গ্রহণ করবেন।
এ ব্যবস্থার ফলে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে জরুরি শাসনের আওতায় ঠিক কীভাবে প্রদেশ পরিচালিত হবে এবং এর মেয়াদ কত দিন থাকবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
প্রদেশটির নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা স্থগিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তি তুলে ধরছে সরকার, অন্যদিকে পিটিআই বলছে, এই সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
পিটিআইয়ের পদযাত্রা ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার আগে কেন্দ্রীয় সরকার ও দলটির মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছিল। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার দাবি করেন, সরকার পিটিআইয়ের প্রায় সব দাবিই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। এমনকি ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার অনুমতি দেওয়ার বিষয়েও সরকার রাজি ছিল বলে তিনি জানান।
তবে সরকারের একটি শর্ত ছিল বলে দাবি করেন তারার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পিটিআইকে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতার নিন্দা জানাতে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারের সঙ্গে যোগ দিতে বলা হয়েছিল।
তারার বলেন, ‘আমরা শুধু একটি বিষয় চেয়েছিলাম। তা হলো দলটি প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতার নিন্দা করবে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে।’
আইনমন্ত্রীর দাবি, পিটিআই ওই শর্তে রাজি হয়নি। সে কারণেই আলোচনা ভেঙে যায়। তবে আলোচনার বিষয়ে পিটিআইয়ের বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
পাকিস্তানে পিটিআইয়ের বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের নজির রয়েছে। দুই বছর আগে দলটির শেষ বড় বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল। এর আগে ২০২৩ সালে ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় তাঁর সমর্থকেরা সামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালান।
এসব ঘটনার কারণে পিটিআইয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা রয়েছে। সাম্প্রতিক ধরপাকড়, জরুরি শাসন জারি এবং প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার ঘটনা সেই উত্তেজনাকে আবার সামনে এনেছে।
বর্তমানে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, আটক নেতা-কর্মীদের বিষয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের আন্দোলন কোন দিকে এগোয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে প্রদেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।