
হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবে উদ্বেগ, রিয়াদ বিমানবন্দরে বিপর্যয়; আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা চাইছে সৌদি সরকার
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় তাঁকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠায় যুবরাজের চলাচল ও অবস্থান গোপন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা একটি বাছাই করা দক্ষ নিরাপত্তা দলের মাধ্যমে তাঁকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেছেন। গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে যুবরাজকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
তবে যুবরাজের নিরাপত্তা নিয়ে এসব তথ্যের বিষয়ে সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার বিমানবন্দরটিতে ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। হামলাটিকে গত এক দশকে সৌদি আরবে সংঘটিত সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হুতি বিদ্রোহীদের এক মুখপাত্র রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। গত পাঁচ দিনে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারবার হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত সপ্তাহান্তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে বিমানবন্দরটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে। উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, অচলাবস্থার কারণে রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে।
বিমানবন্দরে হামলা এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনা সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি সৌদির
হুতি বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান। তিনি বলেছেন, হামলার ভয়াবহতা বিবেচনা করে সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের কঠোর হবে।
তাঁর এ বক্তব্য থেকে হামলার জবাবে সৌদি আরবের পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়েছে। তবে দেশটি কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে, একের পর এক হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত এসব ইন্টারসেপ্টরের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে ভবিষ্যতে হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ
আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
এ পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশটি একদিকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দর রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সৌদি আরবের পক্ষে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় অংশ নেবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের আঞ্চলিক মিত্ররাও দেশটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সংঘাতটি শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সামরিক পরিস্থিতির জন্ম দেবে—তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন সংঘাত
সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দেশটির সরকারের পক্ষে ২০১৫ সালে সৌদি আরব সরাসরি হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই হুতিদের সঙ্গে সৌদি বাহিনীর সংঘাত তীব্র হয়।
দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দর থেকে হুতিদের প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী ইরানের একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের চেষ্টা করলে সৌদি বাহিনী গুলি চালায়—এমন অভিযোগ তোলে হুতিরা। এরপরই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের একটি। তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানোর সামর্থ্য সংঘাতের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হলে তার প্রভাব পড়তে পারে আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও জননিরাপত্তায়।
উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইরান
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আরব উপদ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে তেহরান গভীরভাবে চিন্তিত।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, এ লড়াইয়ের ফলে শুধু ইসরায়েল সরকারই লাভবান হবে। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরানের এ অবস্থানের পাশাপাশি হুতিদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক এবং চলমান আঞ্চলিক সংঘাতে তেহরানের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান ও পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান
উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে গত রোববার রাতে সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাজনৈতিক সমাধানের পথ উপেক্ষা করে কেবল সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করার জন্য রিয়াদকে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করতে তেহরান সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার চেষ্টা চলছে। তবে ধারাবাহিক হামলা, পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে সংলাপ কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরবের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা ধরে রাখা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো। একই সঙ্গে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের খবর দেশটির নেতৃত্বের সুরক্ষা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সামরিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে সৌদি আরব কোন পথ বেছে নেয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।