
রাজধানীর বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলায় আতঙ্কিত প্রবাসী পরিবারগুলো; নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি চাপে পড়তে পারে বিনিয়োগ, পর্যটন ও অর্থনীতি বৈচিত্র্যকরণের পরিকল্পনা
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। বিদেশি কর্মী, বিনিয়োগকারী, পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করতে এই ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় সেই নিরাপত্তার ধারণা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
হামলার পর সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন, সন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে পরিবারকে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তাঁদের বিবেচনায় আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে রিয়াদে বসবাসরত কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিকের উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট, সৌদি আরবের উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ এবং দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার অভিজ্ঞতা থাকলেও সাম্প্রতিক হামলা তাঁদের নিরাপত্তাবোধে ধাক্কা দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এরপর টানা কয়েক দিন সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া যায়। পূর্বাঞ্চলের তেলকেন্দ্র ও দাম্মাম বিমানবন্দরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাব দিতেই তারা এসব হামলা চালিয়েছে।
সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল আখবারিয়ায় প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে বিমানবন্দরের ভেতরে আতঙ্কিত যাত্রীদের ছোটাছুটির দৃশ্য দেখা গেছে বলে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে। ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাদা পোশাক পরা যাত্রীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিলেন। বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাদের কিছু প্যানেল ভেঙে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
বেসামরিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র নয়; এটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, পর্যটন, ব্যবসা এবং জরুরি যাতায়াতেরও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সেখানে হামলা হলে যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি বিমান চলাচল ও দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থাও বিঘ্নিত হতে পারে।
রিয়াদে সাত বছর ধরে বসবাসরত ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, ওমরাহ বা হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা মানুষের জীবন এভাবে ঝুঁকির মুখে পড়া উচিত নয়।
বিলালের মতে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অতীতে ইয়েমেনে যা-ই করে থাকুক, তার অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানো যায় না। একটি বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিলালের বক্তব্যে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত থাকলেও সাধারণ যাত্রীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
সৌদি আরবে বসবাসরত অনেক প্রবাসীর জন্য দেশটি শুধু কর্মস্থল নয়, বরং দীর্ঘদিনের আবাস। তাঁদের সন্তানদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং পারিবারিক জীবন এই দেশকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও হঠাৎ করে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়।
বিলাল বলেন, যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। তিনি ও তাঁর পরিবার সৌদি আরবেই নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন। তবে হামলার মাত্রা ও ধারাবাহিকতা বাড়তে থাকলে পরিবারকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই বিষয়টি ভাববেন।
এই বক্তব্য প্রবাসী পরিবারগুলোর দ্বিধা তুলে ধরে। একদিকে সৌদি আরবের চাকরি ও জীবনযাপনের সুযোগ, অন্যদিকে পরিবারের নিরাপত্তা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে তাঁদের।
প্রায় এক দশক ধরে রিয়াদে বসবাসরত আরেক ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। পরিবার গড়ে তোলার জন্য সৌদি আরবকে এত দিন নিরাপদ মনে করলেও রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর হামলার মুখে পড়ায় তিনি আতঙ্কিত।
মোহাম্মদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক ঘটনা তাঁর সন্তানদেরও ভয় পাইয়ে দিয়েছে। তিনি সন্তানদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির প্রকাশ্যে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানোর পর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
মোহাম্মদের ভাষায়, ‘রিয়াদকে আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।’
তবে কয়েকজন প্রবাসীর অভিজ্ঞতা থেকে সৌদি আরবে বসবাসরত সব বিদেশির মনোভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাঁদের বক্তব্য মূলত হামলার পর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধে তৈরি হওয়া উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে।
হামলার তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরে সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেশটির ভাবমূর্তি। গত কয়েক বছরে সৌদি নেতৃত্ব দেশটিকে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বহুমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদেশি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে কর্মীদের নিরাপত্তা, পরিবহনব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সক্ষমতা বিবেচনা করেন।
কিন্তু রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, পর্যটকদের আগমন এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী মোতায়েনের সিদ্ধান্তেও।
মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর গত রোববার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত একটি জ্বালানি সম্মেলনে হাতে গোনা কয়েকজন প্রতিনিধি অংশ নেন। এ ছাড়া মাত্র দুই সপ্তাহ পর দেশটির অন্যতম বড় ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
এসব আয়োজনের অংশগ্রহণকারী ও বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করেন, তার ওপর আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিবেশের একটি অংশ নির্ভর করতে পারে। তবে হামলার কারণে এসব আয়োজনের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য অংশগ্রহণ, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের তথ্য প্রয়োজন।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা শুধু তেল বিক্রির ওপর নির্ভরশীল নয়। পর্যটন, বিনোদন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সম্প্রসারণও এর অংশ। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ তৈরি হলে এসব খাতের বিকাশে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক হামলার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এবং সৌদি আরবের সঙ্গে হুতি গোষ্ঠীর সংঘাত। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা। ২০১৪ সালে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে গোষ্ঠীটি রাজধানী সানা দখল করে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার রাজধানী ছেড়ে সরে যেতে বাধ্য হয়।
ইয়েমেনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন, জ্বালানি ভর্তুকি কমানো নিয়ে অসন্তোষ এবং জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত জাতীয় সংলাপের ব্যর্থতা হুতিদের উত্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল। প্রস্তাবিত ফেডারেল কাঠামো নিয়ে বিরোধের মধ্যেও গোষ্ঠীটি সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং রাজধানী দখলের পর দক্ষিণাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়।
এই পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো।
সৌদি আরব ও তার মিত্রদের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা এবং যুক্তরাজ্যের তৈরি যুদ্ধবিমান ব্যবহারের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেনের অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে দেশটিতে ক্ষুধা, রোগব্যাধি, বাস্তুচ্যুতি এবং জরুরি সেবার সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
সৌদি আরবের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইয়েমেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হুতিরা বিভিন্ন সময়ে সৌদি ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ফলে দেশটির তেল অবকাঠামো, বিমানবন্দর এবং সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জুলাই মাসে সানা বিমানবন্দরে হামলা চালানোর আগপর্যন্ত সংঘাত অনেকটাই স্থবির ছিল। ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরান থেকে হুতি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমানকে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাজধানীতে অবতরণ করতে বাধা দেওয়া।
এর জবাবে হুতিরা পাল্টা হামলা ও অবরোধের হুমকি দেয়। তাদের বক্তব্য ছিল, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনের আকাশসীমা ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তারাও সৌদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাত হানবে।
পরবর্তী সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচল সীমিত করার ঘোষণাও দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে রপ্তানির বিকল্প রুটের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি শুধু সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জ্বালানি রপ্তানি, সামুদ্রিক পরিবহন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির নিরাপত্তাও জড়িয়ে আছে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটির অর্থনীতিকে তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ, বিনোদনশিল্পের বিকাশ এবং বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের মাধ্যমে সৌদি আরবকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।
এই পরিকল্পনার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে দেশটির স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ওপর। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু সম্ভাব্য মুনাফা নয়, বরং রাজনৈতিক ঝুঁকি, কর্মীদের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতাও বিবেচনা করেন।
সাম্প্রতিক হামলার ফলে সেই হিসাব নতুন করে সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত থাকলে বিদেশি কোম্পানিগুলো কর্মীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে পারে, ভ্রমণনীতি পরিবর্তন করতে পারে অথবা কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা ঘটছে, তা যাচাই করতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের তথ্য প্রয়োজন।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফলে কয়েক দিনের নিরাপত্তা সংকটই পুরো পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বারবার লক্ষ্যবস্তু হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান বিভিন্ন সময়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, ঘাঁটি, অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি কেনার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।
এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার ও নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত এই নিরাপত্তা অংশীদারত্বের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপসাগরীয় অঞ্চলের এক বিশ্লেষক মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক বর্তমানে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে সৌদি আরবকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে বলবেন, অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করার প্রত্যাশা রাখবেন—এমন অবস্থান পরস্পরবিরোধী।
ওই বিশ্লেষক আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কূটনীতির পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সৌদি আরব উদ্বেগ জানিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এতে আঞ্চলিক মিত্রদের এমন একটি সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে, যা তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।
রিয়াদে হামলার পর ট্রাম্প যখন বলেন, সৌদি আরব নিজেই নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম, তখন উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে বলে ওই বিশ্লেষক মনে করেন।
তবে এটি একজন বিশ্লেষকের মূল্যায়ন। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা সম্পর্কের বাস্তব অবস্থা নির্ধারণে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, সামরিক সহযোগিতার ধরন এবং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পদক্ষেপও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের কথা ভাবতে পারে। প্রতিবেদনে গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
চুক্তিটির ঘোষিত উদ্দেশ্য সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তবে সৌদি আরবে তুর্কি সেনা মোতায়েনের সময়, পরিধি এবং এ বিষয়ে আঙ্কারার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
উপসাগরীয় বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে এবং ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু বাস্তব হুমকি দেখা দেওয়ার পর যদি সেই অংশীদারত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়বে।
তবে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক থেকে সরে আসবে বা বিকল্প কোনো জোটের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেশটিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী বসবাস ও কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে পরিবারসহ দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে রয়েছেন। তাঁদের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্ন নয়; এটি চাকরি, সন্তানদের শিক্ষা, আবাসন, আর্থিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ বসবাসের সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
হামলার পর প্রবাসী পরিবারগুলো যদি স্কুল বন্ধ থাকা, বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং নিরাপত্তা সতর্কতা নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকে, তাহলে কেউ কেউ পরিবারকে সাময়িকভাবে নিজ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চাকরি বা বসবাসের জায়গা পরিবর্তনের কথাও বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের মাত্রা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রবাসীদের প্রকৃত মনোভাব বুঝতে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের পরামর্শ, স্কুল ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, কর্মীদের স্থানান্তর এবং বসবাসের অনুমতি-সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন।
এদিকে সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদেশি বাসিন্দা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করা, বিমান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া এই আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
রিয়াদের বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী পরিবারগুলোর উদ্বেগ দেখাচ্ছে, নিরাপত্তার ধারণা শুধু সরকারি ঘোষণা বা সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; মানুষ দৈনন্দিন জীবনে কতটা নিরাপদ বোধ করছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে হামলার প্রভাব সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক আয়োজন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টায় পড়তে পারে। আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল পরিবহন ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ঝুঁকিও বাড়বে।
তবে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং প্রবাসী ও বিনিয়োগকারীদের বাস্তব পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। আপাতত স্পষ্ট যে, হুতিদের হামলা সৌদি আরবের সামনে শুধু সামরিক চ্যালেঞ্জই নয়, বরং নিরাপদ আবাসস্থল ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখার কঠিন প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।