
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন অনেক শিক্ষার্থী। কিন্তু ভর্তি, টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থায়ন নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ কিংবা গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের মাধ্যমে কীভাবে পড়াশোনার খরচ কমানো যায়, কোন পর্যায়ে ফান্ডিং পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং আবেদন প্রস্তুতিতে কী কী বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে—তা জানা থাকলে পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়, সম্পূর্ণ অর্থায়নে পড়ার সুযোগ কতটা, মাসিক স্টাইপেন্ড কত পাওয়া যেতে পারে এবং সব মিলিয়ে কত টাকা প্রয়োজন হবে।
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে শিক্ষার্থীর একাডেমিক ফলাফল, গবেষণার অভিজ্ঞতা, নির্বাচিত বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, শহর এবং সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন কর্মসূচির ওপর। কোনো কোনো শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ টিউশন মওকুফের পাশাপাশি মাসিক ভাতা পান। আবার কারও ক্ষেত্রে আংশিক বৃত্তি বা সীমিত আর্থিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়। বিশেষ করে মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে অর্থায়নের সুযোগ এক রকম নয়।
এখানে স্টাইপেন্ড, টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের যে অঙ্কগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে প্রকৃত ব্যয় এবং অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির আবেদন সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে করতে হয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের ভর্তি-শর্ত আলাদা হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় নথি, আবেদনের সময়সীমা এবং অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা জরুরি।
সাধারণত আবেদনের জন্য যেসব নথি প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো হলো—
একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সনদ: পূর্ববর্তী শিক্ষাজীবনের ফলাফল এবং ডিগ্রির প্রমাণ।
ইংরেজি দক্ষতার সনদ: TOEFL, IELTS বা Duolingo English Test-এর ফলাফল। কোন পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য, তা বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP): কেন নির্দিষ্ট বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, আপনার একাডেমিক আগ্রহ কী এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—তার সুস্পষ্ট বিবরণ।
সুপারিশপত্র: সাধারণত দুই থেকে তিনটি সুপারিশপত্র চাওয়া হতে পারে।
রেজিউমে বা সিভি: শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণার অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দক্ষতার বিবরণ।
GRE বা GMAT-এর ফলাফল: কিছু প্রোগ্রামে প্রয়োজন হতে পারে। অনেক প্রোগ্রামে এগুলো ঐচ্ছিক, আবার কোথাও একেবারেই চাওয়া হয় না।
আবেদন ফি সাধারণত প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ থেকে ১১০ মার্কিন ডলার হতে পারে, যদিও এর চেয়ে কম বা বেশি ফিও রয়েছে। ফলে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে শুধু আবেদন ফিতেই উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে এই হিসাব অনুযায়ী মোট ফি ৫০০ থেকে ১ হাজার ১০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর বাইরে পরীক্ষার ফি, নথি পাঠানো এবং অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক খরচও থাকতে পারে।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রামে আবেদন ফি মওকুফের সুযোগ রয়েছে। তাই আবেদন করার আগে এ ধরনের সুবিধা পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে।
ভর্তির আবেদন এবং অর্থায়নের প্রতিযোগিতায় স্টেটমেন্ট অব পারপাস ও সুপারিশপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামে আবেদনকারীর আগ্রহ, প্রস্তুতি এবং নির্দিষ্ট গবেষণাক্ষেত্রে কাজ করার সক্ষমতা বোঝাতে এসব নথি সহায়ক।
স্টেটমেন্ট অব পারপাসে শুধু নিজের ভালো ফলাফল বা বিদেশে পড়ার ইচ্ছার কথা লিখলেই যথেষ্ট নয়। কেন নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়টি বেছে নিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোন গবেষণাক্ষেত্র আপনার আগ্রহের সঙ্গে মেলে, আগে কী ধরনের কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতে কী করতে চান—এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
একই লেখা সামান্য পরিবর্তন করে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে প্রতিটি প্রোগ্রামের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আবেদন প্রস্তুত করা ভালো। অধ্যাপকের গবেষণার সঙ্গে নিজের আগ্রহের মিল থাকলে তা তথ্যভিত্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
সুপারিশপত্রের ক্ষেত্রেও এমন শিক্ষক বা গবেষকের সুপারিশ সহায়ক হতে পারে, যিনি আবেদনকারীর একাডেমিক দক্ষতা, গবেষণার সক্ষমতা, দায়িত্বশীলতা এবং শেখার আগ্রহ সম্পর্কে নির্দিষ্ট উদাহরণসহ লিখতে পারবেন।
তবে ভালো SOP বা সুপারিশপত্র থাকলেই ভর্তি কিংবা ফান্ডিং নিশ্চিত হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণত আবেদনকারীর সামগ্রিক যোগ্যতা, প্রোগ্রামের চাহিদা, আসনসংখ্যা এবং অর্থায়নের প্রাপ্যতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার ব্যয় কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ। বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে শিক্ষার্থী টিউশন ফি মওকুফ, মাসিক বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভাতা এবং কখনো স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পেতে পারেন।
তবে সব অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে একই ধরনের সুবিধা থাকে না। কোথাও সম্পূর্ণ টিউশন মওকুফ ও স্টাইপেন্ড দেওয়া হয়, আবার কোথাও অর্থায়ন আংশিক হতে পারে। তাই কোনো পদ গ্রহণের আগে অফার লেটারে উল্লেখিত শর্তগুলো ভালোভাবে পড়ে নেওয়া প্রয়োজন।
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে শিক্ষার্থী কোনো অধ্যাপক, গবেষক বা গবেষণা প্রকল্পের অধীনে কাজ করেন। দায়িত্বের মধ্যে থাকতে পারে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, গবেষণাগারে পরীক্ষা পরিচালনা, সাহিত্য পর্যালোচনা, গবেষণার ফলাফল প্রস্তুত এবং গবেষণাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ।
অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থায়নের উৎস হয় অধ্যাপকের গবেষণা অনুদান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট। বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং গবেষণানির্ভর বিভিন্ন বিষয়ে এ ধরনের সুযোগ দেখা যায়। তবে বিষয় ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে সুযোগের ধরন এবং পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামে আবেদনকারীরা সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের গবেষণাক্ষেত্র সম্পর্কে আগে থেকে খোঁজ নিতে পারেন। নিজের আগ্রহ, প্রাসঙ্গিক দক্ষতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে যোগাযোগ করাও কাজে লাগতে পারে। তবে অধ্যাপককে ইমেইল করলেই অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে শিক্ষার্থীরা সাধারণত শিক্ষককে পাঠদানে সহায়তা করেন। এর মধ্যে থাকতে পারে ল্যাব পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অ্যাসাইনমেন্ট বা খাতা মূল্যায়ন এবং ক্লাসের প্রস্তুতিমূলক কাজে অংশ নেওয়া।
এর বিনিময়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন মওকুফ ও স্টাইপেন্ড দেওয়া হয়। তবে সুবিধার পরিমাণ এবং কাজের দায়িত্ব বিভাগ ও নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
যেসব পদে সরাসরি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, সেখানে ইংরেজিতে কথা বলা ও বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের আগে আলাদা ভাষাগত মূল্যায়ন বা পরীক্ষা দিতে হতে পারে।
গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ একটি বিস্তৃত পরিভাষা। এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগ, লাইব্রেরি, শিক্ষার্থীসেবা, গবেষণা সহায়তা বা অন্যান্য দপ্তরে কাজের সুযোগ থাকতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে GA-এর সংজ্ঞা এবং সুবিধা আলাদা হতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠানে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ও টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপকেও গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অনেক অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে সপ্তাহে প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজের শর্ত থাকে। তবে কাজের সময়, দায়িত্ব, ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা এবং টিউশন মওকুফের নিয়ম নিয়োগপত্রে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। তাই শুধু পদের নাম দেখে অর্থায়নের ধরন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থায়নের সুযোগ বুঝতে হলে মাস্টার্স ও পিএইচডির মধ্যে পার্থক্য জানা জরুরি।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামের সঙ্গে অর্থায়নের সুযোগ যুক্ত থাকে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণানির্ভর বিষয়ে যোগ্য শিক্ষার্থীরা টিউশন মওকুফ এবং স্টাইপেন্ডসহ ফান্ডিং প্যাকেজ পেতে পারেন।
কোনো কোনো প্রোগ্রামে ভর্তি প্রস্তাবের সঙ্গেই অর্থায়নের তথ্য জানানো হয়। অন্য ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে গবেষণা বা শিক্ষণ সহকারী পদের জন্য বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে সব পিএইচডি প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ অর্থায়ন দেয় না। অর্থায়নের মেয়াদ, শর্ত, কাজের দায়িত্ব, শিক্ষাগত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তা এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ফান্ডিং নবায়নের নিয়ম যাচাই করা জরুরি।
কোর্সভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে সম্পূর্ণ অর্থায়ন পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কঠিন। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি বা আংশিক টিউশন ছাড় থাকলেও পুরো টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করার মতো অর্থায়ন সব প্রোগ্রামে পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, থিসিসভিত্তিক বা গবেষণানির্ভর মাস্টার্স প্রোগ্রামে গবেষণা ও শিক্ষণ সহকারী পদের সুযোগ থাকতে পারে। তবে এসব পদ সীমিত হতে পারে এবং আবেদনকারীর যোগ্যতা, বিভাগের বাজেট ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের প্রকল্পের ওপর নির্ভর করতে পারে।
কিছু শিক্ষার্থী ভর্তির পর অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পান। কিন্তু শুরুতে ফান্ডিং না থাকলে পরবর্তী সময়ে তা পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই মাস্টার্সে আবেদন করার সময় অর্থায়ন না পেলে কীভাবে খরচ চালানো হবে, তার বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিকল্পনা রাখা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে স্টাইপেন্ডের পরিমাণ নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, শহর, অর্থায়নের উৎস এবং শিক্ষার্থীর দায়িত্বের ওপর। সাধারণ ধারণা হিসেবে, কিছু পিএইচডি প্রোগ্রামে বছরে প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার স্টাইপেন্ড পাওয়া যেতে পারে। তবে অনেক প্রোগ্রামে এর চেয়ে কম বা বেশি অঙ্কও থাকতে পারে।
মাস্টার্স পর্যায়ের অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে ভাতার পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে। আবার কিছু পদের সুবিধা কেবল টিউশন মওকুফ পর্যন্ত সীমিত থাকতে পারে। তাই একটি সাধারণ অঙ্ক ধরে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন বিচার করা ঠিক নয়।
স্টাইপেন্ডের পাশাপাশি টিউশন মওকুফ, স্বাস্থ্যবিমা, বাধ্যতামূলক ফি এবং গ্রীষ্মকালীন অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। কোনো অফারে বার্ষিক স্টাইপেন্ড বেশি হলেও যদি টিউশন ফি বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক খরচ শিক্ষার্থীকে নিজে দিতে হয়, তাহলে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা কমে যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। বড় শহরে বাসাভাড়া, যাতায়াত ও দৈনন্দিন খরচ বেশি হতে পারে। ফলে তুলনামূলক বেশি স্টাইপেন্ড পেয়েও সঞ্চয় কম হতে পারে। অন্যদিকে, কম ব্যয়ের বিশ্ববিদ্যালয়-শহরে তুলনামূলক কম ভাতায়ও প্রয়োজনীয় খরচ চালানো সহজ হতে পারে।
তাই শুধু স্টাইপেন্ডের অঙ্ক নয়, সেটি দিয়ে সংশ্লিষ্ট শহরে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব কি না, তা হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ফান্ডিং ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার খরচ অনেক বেশি হতে পারে। টিউশন ফি, বাসস্থান, খাবার, স্বাস্থ্যবিমা এবং অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বার্ষিক খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
সাধারণ ধারণা হিসেবে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বছরে প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডলার হতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।
তবে এসব অঙ্ক সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রামে ফি তুলনামূলক কম হতে পারে, আবার বিশেষায়িত বা ব্যয়বহুল প্রোগ্রামে খরচ আরও বেশি হতে পারে।
বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচের জন্য বছরে প্রায় ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার বা তারও বেশি প্রয়োজন হতে পারে। নিউইয়র্ক, বোস্টন ও ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু বড় শহরে ব্যয় বেশি হতে পারে। তুলনামূলক ছোট বিশ্ববিদ্যালয়-শহরে খরচ কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব করার সময় শুধু টিউশন ফি ও বাসাভাড়ার দিকে নজর দিলেই চলবে না। আবেদন ফি, ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষার ফি, ভিসা ও SEVIS-সংক্রান্ত ফি, স্বাস্থ্যবিমা, বিমানভাড়া, বই, শীতবস্ত্র এবং বাসায় ওঠার প্রাথমিক খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।
ফান্ডিং না থাকলে একজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর বার্ষিক মোট ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। তবে এটি কেবল একটি সাধারণ অনুমান; প্রকৃত খরচ জানতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Cost of Attendance’ বা শিক্ষাব্যয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাব দেখা উচিত।
সম্পূর্ণ অর্থায়ন পাওয়া গেলেও সব খরচ যে বহন করা হবে, তা নিশ্চিত নয়। কোনো অফারে টিউশন ফি মওকুফ থাকলেও স্বাস্থ্যবিমা, বাধ্যতামূলক ফি বা অন্যান্য ব্যয় শিক্ষার্থীকে বহন করতে হতে পারে। তাই অফার লেটারে কোন কোন খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার পরিকল্পনা করার সময় শিক্ষার্থী ভিসার নিয়ম সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবস্থানের মেয়াদ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধি প্রকাশ করা হয়েছিল।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (DHS) ১৭ জুলাই ২০২৬-এ একটি চূড়ান্ত বিধি প্রকাশ করে। এতে এফ-১ শিক্ষার্থী ও জে-১ বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রচলিত ‘Duration of Status’ ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদে অবস্থানের ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়। বিধিটি ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। <Link url="https://www.federalregister.gov/" title="ফেডারেল রেজিস্টার"/>–এ প্রকাশিত বিধির তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পরিবর্তনে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসার কথা ছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ একটি ফেডারেল আদালত বিধিটির কার্যকারিতা স্থগিত করে। ফলে নির্ধারিত ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে পরিবর্তনটি কার্যকর হয়নি। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত বা নতুন সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই বিধির বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। <Link url="https://internationalservices.georgetown.edu/fixed-aud/" title="জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দপ্তরের হালনাগাদ নির্দেশনা"/>–তেও এ স্থগিতাদেশের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে ভিসার নিয়ম পরিবর্তন হয়ে গেছে—এমন ধারণা করে আবেদনকারী বা শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কার্যালয় বা মনোনীত স্কুল কর্মকর্তা (DSO)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে বর্তমান নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রোগ্রামের মেয়াদ বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন, নতুন ডিগ্রিতে ভর্তি এবং পড়াশোনা-পরবর্তী ঐচ্ছিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ (OPT) নিয়ে পরিকল্পনা করার সময় সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
ভিসা ও অভিবাসনবিধি পরিবর্তনশীল হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শের পাশাপাশি মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা উচিত।
১. অন্তত ৮ থেকে ১২ মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সীমা, পরীক্ষার তারিখ, সুপারিশপত্র সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করতে সময় লাগে। আগে থেকে পরিকল্পনা করলে তাড়াহুড়া কমে এবং উপযুক্ত প্রোগ্রাম বেছে নেওয়া সহজ হয়।
২. ফান্ডিংয়ের ধরন দেখে প্রোগ্রাম নির্বাচন করুন।
মাস্টার্সে আবেদন করলে কোন প্রোগ্রামে বৃত্তি, টিউশন মওকুফ বা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের সুযোগ রয়েছে, তা খুঁজে দেখুন। পিএইচডির ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়, সম্ভাব্য তত্ত্বাবধায়ক এবং অর্থায়নের শর্ত সম্পর্কে জানুন।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বৈচিত্র্য রাখুন।
শুধু অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন না করে নিজের যোগ্যতা, গবেষণার আগ্রহ, বাজেট এবং প্রোগ্রামের শর্ত বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি বা ফান্ডিং নিশ্চিত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
৪. বিকল্প আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করুন।
আবেদনের সময় ফান্ডিং না পেলে কীভাবে পড়াশোনার খরচ বহন করবেন, তা আগেই হিসাব করুন। আংশিক অর্থায়ন পেলে বাকি খরচের উৎস কী হবে, সেটিও পরিষ্কার থাকা দরকার।
৫. শতভাগ নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি থেকে সতর্ক থাকুন।
কোনো পরামর্শক বা প্রতিষ্ঠান যদি ভর্তি, ফুল ফান্ডিং কিংবা ভিসার শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সতর্ক হোন। এসব সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নেয়। কোনো পরামর্শক আবেদন প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে পারেন না।
সিএইচএস এডুকেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও উচ্চশিক্ষা পরামর্শক নাজমুল হাসান রাজুর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করার সময় শিক্ষার্থীর একাডেমিক প্রোফাইল, গবেষণার আগ্রহ, লক্ষ্য এবং বাজেটের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ নির্বাচন, আবেদন প্রস্তুতি, অর্থায়নের সম্ভাবনা মূল্যায়ন এবং ভিসা সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ভর্তি, অর্থায়ন ও ভিসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে ফুল ফান্ডিং নিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব হলেও এর জন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং প্রোগ্রামভিত্তিক প্রস্তুতি। স্টাইপেন্ডের অঙ্ক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ওপর নির্ভর না করে অর্থায়নের শর্ত, জীবনযাত্রার ব্যয়, একাডেমিক যোগ্যতা এবং ভিসার হালনাগাদ নিয়ম একসঙ্গে বিবেচনা করলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
লেখক: নাজমুল হাসান রাজু, উচ্চশিক্ষা পরামর্শক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সিএইচএস এডুকেশন লিমিটেড।