
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে ভারতের প্রতি নির্ভরশীলতার মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তাঁর অভিযোগ, গত ১৬ থেকে ১৭ বছরে বাংলাদেশকে একমুখী সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্বের ওপরও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) পায়রা চত্বরে কালচারাল ইউনিটি বাংলাদেশ আয়োজিত প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা সভা ও লালনগীতির অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, বিগত ১৬ থেকে ১৭ বছরে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর মতে, কোনো দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে সেই দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপরও প্রভাব বিস্তার করা সহজ হয়। এ কারণে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছিল।
রিজভী বলেন, একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শুধু ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সেই দেশের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বতন্ত্র পরিচয়ও জড়িত। এসব ক্ষেত্রে অন্য দেশের একক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিবেশী দেশের প্রভাব বাড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রাধান্য দেওয়া, তাঁদের গান প্রচার এবং দেশের সিনেমা হলগুলোতে ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এসব বিষয়ে সে সময় প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিবাদ হয়নি বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির এই নেতা।
বক্তব্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, শেখ হাসিনা একসময় বলেছিলেন, তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন, তা ভারত কখনো ভুলবে না।
এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে রিজভী প্রশ্ন তোলেন, একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতকে কী দিয়েছিলেন, যার কথা বাংলাদেশের জনগণ জানত না। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ, ভূমি কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে বলেও বক্তব্য দেন তিনি।
রিজভীর অভিযোগ, ক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে বিগত সরকার দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করেছে। তবে তাঁর এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য; বক্তব্যে উত্থাপিত নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর পক্ষে অনুষ্ঠানে কোনো বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক কাজী জেসিন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশের অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মুক্তি অর্জিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
কাজী জেসিনের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরেক ধরনের সংকট দেখা দেয়। সে সময় ধর্মের অজুহাতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে পরিবেশনা করতে গিয়ে শিল্পীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বিটিভির মহাপরিচালক।
তাঁর বক্তব্যে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি মতপ্রকাশের অধিকার এবং শিল্পীদের স্বাধীনভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা ও লালনগীতিকে কেন্দ্র করে। বাংলা লোকসংগীত ও বাউল দর্শনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব লালন সাঁইয়ের গান ও দর্শন দীর্ঘদিন ধরে মানবতা, সাম্য, আত্মপরিচয় এবং সামাজিক বিভাজন অতিক্রমের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
এ ধরনের আয়োজনে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, নিজস্ব ঐতিহ্যের চর্চা এবং বিভিন্ন মত ও বিশ্বাসের মানুষের সহাবস্থানের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্যেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা উঠে আসে।
বক্তারা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিসরে স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
কালচারাল ইউনিটি বাংলাদেশ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রুহুল কবির রিজভী ও বিশেষ অতিথি কাজী জেসিন ছাড়াও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন।
অনুষ্ঠানে লালন সাঁইয়ের জীবন, দর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সব মিলিয়ে, লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের এ আয়োজন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্মরণের পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক পরিসর ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মতপ্রকাশের একটি মঞ্চ হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে কাজী জেসিন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন সামনে আনেন।