
সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা এখনো আটক; এসআইআর বন্ধের দাবিতে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ
ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে দেশটির মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এ দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, নারী অধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আটক সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও দলটির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা এখনো আটক রয়েছেন।
শনিবার বিকেলে দিল্লিতে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকারনামায় সই নিয়ে দিপকেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে শুক্রবার ‘লেহরা দো তেরঙ্গা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাঁকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। একই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আটক অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাও শনিবার সকালে মুক্তি পান।
ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে একের পর এক বিক্ষোভ, আটক ও মুক্তির ঘটনা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অনিয়ম এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে ‘লেহরা দো তেরঙ্গা’ বা ‘জাতীয় পতাকা উড়তে দাও’ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে। কর্মসূচিটি আয়োজন না করার নির্দেশ দিয়ে তাঁকে নোটিশ দিয়েছিল পুলিশ। তবে দিপকে সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তাঁকে আটক করা হয়।
শনিবার বিকেলে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকারনামায় সই করিয়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে শুক্রবার যন্তর মন্তরের পাশ থেকে আইসা সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করা হয়েছিল। শনিবার সকালে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুক্তির পর নেহা বোরা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বন্ধ এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি আবারও জানান। এর আগে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময়ও তাঁকে আটক করে পরে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
সিজেপি প্রধান দিপকে মুক্তি পেলেও দলটির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার মুক্তি এখনো মেলেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার যন্তর মন্তরে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিক্ষোভস্থলে প্রবেশের অভিযোগে তাঁদের পাঁচ দিনের বিচারিক হেফাজতে পাঠিয়েছিলেন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁদের সঙ্গে সিজেপির আরও কয়েকজন সদস্যও ছিলেন।
সৌরভ ও রাঙ্কার আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগ এনেছে। এর আগে ১১ অক্টোবর দিল্লি ক্যান্ট থানায় বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাঁরা শান্তিভঙ্গ না করার মুচলেকা দিয়েছিলেন। তবে পুলিশ অভিযোগ করেছে, তাঁরা ওই শর্ত ভঙ্গ করেছেন।
অন্যদিকে, সিজেপি নেতা অজিঙ্কা শিন্দেকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিজেপির নেতাকর্মীদের ধারাবাহিক আটক ও মুক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে তাঁরা পুলিশি বাধার মুখে পড়ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ গেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ার ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, রাজনৈতিক কারণে কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তাঁদের পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের একাংশ মনে করছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, বাদ পড়া নামের ক্ষেত্রে ভুল সংশোধন ও পুনর্নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে পুলিশি আচরণের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হয়েছে। শনিবার দিল্লিতে কয়েকটি নারী সংগঠন ও অধিকারকর্মী পুলিশ সদর দপ্তরের দিকে মিছিল করেন।
মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নারী ও ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নিপীড়ন চালানো হয়েছে। তাঁরা এসব ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও তোলেন তাঁরা।
এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে নারী ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকার এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতি পুলিশের আচরণসংক্রান্ত অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
দিল্লির বাইরে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতেও সিইসির পদত্যাগ ও এসআইআর বন্ধের দাবিতে রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) চেন্নাইয়ে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেয়।
সিইসির অপসারণ এবং এসআইআর-বিরোধী এ কর্মসূচিতে দলটির প্রতিনিধিরাও যোগ দেন। গত ৩ অক্টোবর বিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার পর সিইসিবিরোধী বিক্ষোভে এটিই টিভিকের প্রথম অংশগ্রহণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিভিকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনবিরোধী আন্দোলন দিল্লির বাইরেও রাজনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বিরোধী দলগুলোর এই যৌথ কর্মসূচি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারতে এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে চলমান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, বাদ পড়া ভোটারদের অধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা এবং সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা জরুরি। তাঁদের মতে, এ বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ প্রয়োজন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি এবং ভুলবশত বাদ পড়া ব্যক্তিদের পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের আটক, শর্তসাপেক্ষে মুক্তি এবং বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে মুক্তি পেলেও সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা আটক থাকায় তাঁদের মুক্তির বিষয়টিও আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি এবং ভোটার তালিকা সংশোধনে জনআস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা, বাদ পড়া ভোটারদের পুনর্নিবন্ধনের সুযোগ এবং অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।