
৪০ বছর বয়সী সন্দেহভাজন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে তালিকাভুক্ত; সহিংসতায় আড়াই হাজারের বেশি গ্রেপ্তার, আহত প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য
ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার মধ্যে উনিশ শতকের একটি ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি কট্টর বামপন্থী একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে তাঁর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
গত শনিবার ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলীয় শহর লিমোজের ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন লাগে। এতে ভবনটির নকশাখচিত ঘড়ির মিনার ও ছাদের একাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুন দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্সইনফো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগেও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ ছিল। তাঁকে ‘এস’ শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফ্রান্সে এ ধরনের তালিকাভুক্তির অর্থ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এ তালিকায় থাকার অর্থ নিজে থেকেই কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে ফ্রান্সে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। পরে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও প্রতিবাদী গোষ্ঠী আন্দোলনে যুক্ত হলে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
লিমোজ শহরের উনিশ শতকের সিটি হলটি স্থাপত্যশৈলী ও কারুকাজের জন্য পরিচিত। গত শনিবারের আগুনে ভবনটির ছাদ ও ঘড়ির মিনার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিক্ষোভের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনা দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি কত দূর এবং আগুন দেওয়ার ঘটনায় তাঁর ভূমিকার বিষয়ে কী প্রমাণ পাওয়া গেছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিক্ষোভের সময় সরকারি ভবন, দোকানপাট ও যানবাহনে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে মুখোশ ও কালো পোশাক পরা ব্যক্তিদের গাড়ি ও ভবনে আগুন দিতে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালাতে দেখা গেছে।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন সরকারি কৌঁসুলিদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তা, জেন্ডারমেস—অর্থাৎ ফরাসি আধা সামরিক পুলিশ—এবং অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের ওপর হামলা, দোকানপাটে লুটপাট ও সরকারি ভবনে আক্রমণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ডারমানিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুকম্পা দেখানো উচিত নয়। তবে সহিংসতা মোকাবিলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির প্রয়োজন নেই বলেও মনে করেন তিনি।
বিচারমন্ত্রী বলেন, জরুরি অবস্থা জারি করা হলে সব ফরাসি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এমন ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে সহিংসতা দমন করা যায়, আবার সাধারণ মানুষের স্বাধীনতাও অযথা সীমিত না হয়।
তবে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকরনু এর আগে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। ফলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সান্ধ্য আইন এবং জনসমাগম ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকরনু জানিয়েছেন, সোমবার থেকে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সান্ধ্য আইন কার্যকর করার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, রাতটি তুলনামূলক শান্ত ছিল।
রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল প্লেস দে লা রিপাবলিক, যেখানে সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছিলেন। এ ছাড়া লেস হেলস শপিং এলাকাতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের মার্সেই, বোর্দো, নিস ও লিওঁ এবং উত্তরাঞ্চলের লিলসহ বিভিন্ন শহরে তরুণদের চলাচল ও সমাবেশ নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ কর্মকর্তা ও জেন্ডারমেসদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার রাতেও সান্ধ্য আইন কার্যকর থাকবে কি না, তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেকরনু বলেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও মেয়ররা নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ, সব এলাকায় একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ না করে স্থানীয় পরিস্থিতির ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রাতে দক্ষিণাঞ্চলের শহর লিওঁর রাস্তাঘাট তুলনামূলক শান্ত ছিল। তবে বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ব্যবহৃত গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
এত বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তাকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরছে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেছিলেন, কিছু শহরে পুলিশ পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন।
এই সমালোচনার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। ফলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ নিয়ে সরকার রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।
ফ্রান্সে বর্তমান বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল গত মাসে। শুরুতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনের পরিসর বাড়িয়ে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী আন্দোলনে যোগ দেয়। এতে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা বাড়ে এবং আন্দোলন দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিক্ষোভকারীদের সব অংশ এসব সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না, সে বিষয়ে আলাদা করে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
ফ্রান্সের চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিআই) প্রধান জানিয়েছেন, সহিংসতায় দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আন্দোলনের প্রভাব শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
প্যারিস, মার্সেইসহ বড় ও ছোট বিভিন্ন শহরে গাড়ি ও ভবনে আগুন দেওয়া এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভের আয়োজকেরা আগামী শনিবার ফ্রান্সজুড়ে দ্বিতীয় দফার প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে, অন্যদিকে সরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা, জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনা এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে।
লিমোজের ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতি। তবে তদন্তের ফলাফল ও আদালতের সিদ্ধান্তের আগে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আগামী শনিবারের কর্মসূচির আগে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সরকার কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় এবং বিক্ষোভকারীদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে—এসবের ওপরই ফ্রান্সের চলমান সংকটের পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।