
বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান যেন শিক্ষার্থীদের কর্মজীবন ও বাস্তব জীবনে কার্যকরভাবে কাজে লাগে, সে জন্য উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে দেশের পাঁচ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জাতীয় পর্যায়ে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে আরও কর্মজীবনমুখী, বাস্তবভিত্তিক ও প্রাসঙ্গিক করার তাগিদ দিয়েছেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বলেছেন, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর চাকরি, উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী তাঁদের অর্জিত জ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারছেন না। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
গত সোমবার কক্সবাজারের একটি হোটেলে চার দিনব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনারস’ কার্যক্রমের সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের রূপান্তরের জন্য ইউজিসি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। শিগগিরই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পরিকল্পনাটির কার্যকর বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশ এবং জ্ঞানকে বাস্তবমুখী কাজে প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইউজিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের পাঁচ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য মাস্টার ট্রেইনার ও ন্যাশনাল ট্রেইনার তৈরি করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব প্রশিক্ষকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য দেশের বাইরে নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশেই মানসম্মত প্রশিক্ষণের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক তৈরি এবং বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেশেই আয়োজন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মান বজায় রাখা এবং দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, ইউজিসি দেশের শিক্ষকদের দেশেই কার্যকর প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে সহায়তা পাওয়া যাবে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানকে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলকে ধন্যবাদ জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপকদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষাকে আরও কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক করে তোলার উদ্যোগে নবপ্রশিক্ষিত ন্যাশনাল ট্রেইনারদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তাঁদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিস্তৃত হলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা বিকাশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
ইউজিসির হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় ‘জুনিয়র ফ্যাকাল্টি প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর অংশ হিসেবে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
১৬ অক্টোবর শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ জন অধ্যাপক অংশ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ন্যাশনাল ট্রেইনার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের একটি দক্ষ দল গড়ে তোলা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যকর সুফল পেতে প্রশিক্ষণের অর্জন শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণের সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মাছুমা হাবিব, ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্টিফেন ফোর্বস, অ্যাডভান্স এইচইর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট বেন ব্রাবন এবং হিট প্রকল্পের ফ্যাকাল্টি প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ন্যাশনাল ট্রেইনার, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপক এবং ইউজিসি, হিট প্রকল্প ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
উচ্চশিক্ষাকে কর্মজীবন ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে আরও সংগতিপূর্ণ করে তোলার লক্ষ্যে ইউজিসির এ উদ্যোগে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, অর্জিত দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর।