
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা
একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে মুক্তিপণ হিসেবে দুই লাখ মার্কিন ডলার ও চারটি প্যারাস্যুট আদায় করেছিলেন এক ব্যক্তি। এরপর উড়োজাহাজটি যখন আকাশে, তখন পেছনের সিঁড়ি দিয়ে প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দেন তিনি। সঙ্গে ছিল বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু সেই রাতের পর তাঁকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি কি ঝাঁপ দেওয়ার পর মারা গিয়েছিলেন, নাকি নতুন পরিচয়ে কোথাও জীবন কাটিয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
ঘটনাটি ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বরের। যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটলগামী নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইনসের ৩০৫ নম্বর ফ্লাইটে চেপেছিলেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। টিকিট কেনার সময় নিজের নাম জানিয়েছিলেন ড্যান কুপার। উড়োজাহাজে উঠে তিনি শান্তভাবে বসেছিলেন, পানীয়ও অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পরই বিমানবালার হাতে একটি চিরকুট দিয়ে জানান, তাঁর ব্রিফকেসে বোমা রয়েছে।
এরপর শুরু হয় এমন এক ঘটনা, যা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের দীর্ঘতম তদন্তগুলোর একটিতে পরিণত হয়। কয়েক দশক ধরে তদন্ত, শত শত সাক্ষাৎকার, অসংখ্য সন্দেহভাজন এবং ফরেনসিক পরীক্ষার পরও ছিনতাইকারীর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
সংবাদমাধ্যমের ভুল পরিচিতি থেকে লোকটি পরিচিতি পান ‘ডি বি কুপার’ নামে। সেই নামেই তিনি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত রহস্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। এফবিআই ২০১৬ সালে মামলাটির সক্রিয় তদন্তে বরাদ্দ সম্পদ অন্য কাজে সরিয়ে নেয়। কিন্তু ছিনতাইকারী বেঁচে ছিলেন কি না, তাঁর পরিচয় কী ছিল এবং মুক্তিপণের বাকি অর্থ কোথায় গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর পোর্টল্যান্ড বিমানবন্দর থেকে সিয়াটলের উদ্দেশে উড়েছিল নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭২৭ উড়োজাহাজটি। ফ্লাইটে থাকা ব্যক্তিটি নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ড্যান কুপার নামে। তাঁর বয়স আনুমানিক চল্লিশের কোঠায় বলে পরে বিমানকর্মীরা তদন্তকারীদের জানিয়েছিলেন। পরনে ছিল গাঢ় রঙের ব্যবসায়িক পোশাক, সাদা শার্ট ও কালো টাই।
উড়োজাহাজটি আকাশে ওঠার পর তিনি বিমানবালার হাতে একটি চিরকুট দেন। তাতে বলা হয়, তাঁর ব্রিফকেসে বোমা রয়েছে। পরে তিনি ব্রিফকেস খুলে তার ভেতরে তার ও লাল রঙের কাঠির মতো কিছু বস্তু দেখান বলে তদন্তের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কুপারের দাবি ছিল স্পষ্ট: যাত্রীদের নিরাপত্তার বিনিময়ে তাঁকে দিতে হবে দুই লাখ ডলার, সবগুলো ২০ ডলারের নোটে, এবং চারটি প্যারাস্যুট। তাঁর দাবি পূরণ না হলে উড়োজাহাজে বিস্ফোরণ ঘটানোর হুমকি দেন তিনি।
বিমানকর্মীরা তাঁর দাবি পাইলটের কাছে পৌঁছে দেন। পরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হলে ছিনতাইকারীর দাবি মেনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। উড়োজাহাজটি সিয়াটলে অবতরণ করার পর ৩৬ জন যাত্রীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিনিময়ে কুপারের হাতে তুলে দেওয়া হয় নির্ধারিত অর্থ ও প্যারাস্যুট।
তবে এখানেই ঘটনার শেষ হয়নি। কুপার কয়েকজন বিমানকর্মীকে উড়োজাহাজে রেখে সেটিকে আবার আকাশে ওড়ানোর নির্দেশ দেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানটি মেক্সিকো সিটির দিকে যাবে। উড়োজাহাজকে কম উচ্চতায় ওড়ানো এবং পেছনের সিঁড়ি নামানোর ব্যবস্থাসহ আরও কিছু নির্দেশ দেন তিনি।
সিয়াটল থেকে উড়োজাহাজটি আবার যাত্রা শুরু করার পর কুপার তাঁর পরিকল্পনার শেষ ধাপে এগিয়ে যান। বাইরে তখন রাত। ঠান্ডা, বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের মধ্যে উড়োজাহাজটি কম উচ্চতায় উড়ছিল।
রাত আটটার কিছু পরে, সিয়াটল ও নেভাদার রেনোর মাঝামাঝি পথে, দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়াশিংটনের আকাশে উড়োজাহাজটির পেছনের সিঁড়ি দিয়ে প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিল মুক্তিপণের অর্থ। উড়োজাহাজের যাত্রা-সংক্রান্ত তথ্য ও বিমানকর্মীদের বর্ণনা থেকে তদন্তকারীরা ধারণা করেন, ঝাঁপ দেওয়ার সময়টি ছিল রাত আটটা ১৩ মিনিটের কাছাকাছি।
এরপর উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করে। কিন্তু কুপার কোথায় গেলেন, তা কেউ জানত না।
তদন্তকারীরা সম্ভাব্য অবতরণস্থল খুঁজতে শুরু করেন। উড়োজাহাজের ভেতর তল্লাশি চালানো হয়, বিমানকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা অনুসন্ধান করা হয়। কিন্তু ছিনতাইকারীর দেহ, ব্যবহৃত প্যারাস্যুট কিংবা মুক্তিপণের বেশির ভাগ অর্থের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কুপার কি আগে থেকেই পালানোর পথ নির্ধারণ করেছিলেন? ঝাঁপ দেওয়ার পর তিনি কি নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় অবতরণ করতে পেরেছিলেন? নাকি রাতের অন্ধকার ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন? প্রাথমিক তদন্তের পর থেকেই এসব প্রশ্ন সামনে আসে।
ছিনতাইকারী টিকিট কেনার সময় নিজের নাম জানিয়েছিলেন ড্যান কুপার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘ডি বি কুপার’ হিসেবে। এফবিআইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের একটি ভুল পরিচিতি থেকেই ‘ডি বি’ নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ছিনতাইকারীর প্রকৃত নাম কখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
তদন্তে বিমানবালাদের বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, লোকটি শান্ত স্বভাবের ছিলেন এবং তাঁর পোশাক-আশাক ছিল ব্যবসায়ীদের মতো। তিনি বোরবন হুইস্কি ও সোডা পান করেছিলেন। তবে এসব বর্ণনা দিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
উড়োজাহাজ থেকে পাওয়া আলামতের মধ্যে ছিল কুপারের কালো ক্লিপ-অন টাই। এ ছাড়া তদন্তকারীরা উড়োজাহাজের ভেতর থেকে অন্যান্য সম্ভাব্য আলামতও সংগ্রহ করেন। পরে টাইটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এফবিআই তদন্তটির নাম দেয় ‘নরজ্যাক’—নর্থওয়েস্ট হাইজ্যাকিংয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ। তদন্তকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় সূত্র অনুসরণ করেন, সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের খোঁজ করেন এবং অসংখ্য মানুষের সাক্ষাৎকার নেন। ঘটনার পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আট শতাধিক ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তারপরও কুপারের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
ডি বি কুপারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দেওয়ার পর বেঁচে ছিলেন কি না।
একটি সম্ভাবনা হলো, কুপার আগে থেকেই পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন এবং প্যারাস্যুট ব্যবহার সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা ছিল। মুক্তিপণের অর্থ ও প্যারাস্যুট সংগ্রহের পর উড়োজাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, তিনি ঝুঁকি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তবে তিনি প্রশিক্ষিত প্যারাস্যুটবিদ ছিলেন—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরং পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাতের অন্ধকারে, বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের মধ্যে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় এবং নিচে বনভূমি থাকা অবস্থায় উড়োজাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়া ছিল বড় ধরনের ঝুঁকি। তাঁর পোশাক ও জুতাও দুর্গম এলাকায় অবতরণের জন্য উপযুক্ত ছিল না বলে তদন্তকারীরা ধারণা করেছিলেন।
প্যারাস্যুটের বিষয়টিও রহস্যের একটি অংশ। কুপার চারটি প্যারাস্যুট চেয়েছিলেন, কিন্তু উড়োজাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সময় সঙ্গে নিয়েছিলেন দুটি। এর একটি ছিল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত প্যারাস্যুট, যা সেলাই করে বন্ধ করা ছিল। ফলে সেটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। অন্য প্যারাস্যুটের দড়ি ব্যবহার করে তিনি মুক্তিপণের অর্থের ব্যাগ বেঁধেছিলেন বলে এফবিআইয়ের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা মনে করেছিলেন, ঝাঁপ দেওয়ার পর কুপার মারা গিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁর দেহ বা মৃত্যুর অন্য কোনো নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়ায় এ ধারণাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। একইভাবে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষেও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি সামনে আসে ঘটনার প্রায় নয় বছর পর, ১৯৮০ সালে।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে কলাম্বিয়া নদীর তীরে বালির মধ্যে পচে যাওয়া কিছু নোট খুঁজে পায় একটি শিশু। নোটগুলোর মোট মূল্য ছিল প্রায় ৫ হাজার ৮০০ ডলার। সিরিয়াল নম্বর পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো কুপারকে দেওয়া মুক্তিপণের অর্থের অংশ।
এই আবিষ্কার তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। কুপার কি নদীর কাছাকাছি কোথাও অবতরণ করেছিলেন? তিনি কি ঝাঁপ দেওয়ার পর আহত হয়ে মারা গিয়েছিলেন? নাকি পালানোর পথে কোনো কারণে অর্থের একটি অংশ নদীর তীরে পৌঁছেছিল?
টাকাগুলো কোথা থেকে এবং কীভাবে নদীর তীরে এল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। উদ্ধার হওয়া অর্থ মুক্তিপণের অংশ হলেও সেটি কুপারের মৃত্যুর প্রমাণ নয়। একইভাবে এই আবিষ্কার তাঁর বেঁচে থাকারও প্রমাণ দেয় না।
মুক্তিপণের অর্থের এত সামান্য অংশ পাওয়া যাওয়ায় বাকি টাকার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। কুপার যদি দুর্ঘটনায় মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর দেহ ও প্যারাস্যুটের সন্ধান কেন পাওয়া গেল না? আর যদি তিনি বেঁচে গিয়ে থাকেন, তাহলে এত বছরেও তাঁর পরিচয় প্রকাশ পেল না কেন?
নদীর তীরে পাওয়া অর্থ রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও তা কোনো চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি।
বছরের পর বছর ধরে ডি বি কুপারের পরিচয় নিয়ে নানা ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে আলোচিত একজন রিচার্ড ফ্লয়েড ম্যাককয় জুনিয়র। ১৯৭২ সালে তিনি আরেকটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে প্যারাস্যুট নিয়ে পালানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এ কারণে অনেকে তাঁকে ১৯৭১ সালের ছিনতাইকারী বলে সন্দেহ করেছিলেন।
তবে একই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানেই দুটি ঘটনার অপরাধী একই ব্যক্তি—এমন নয়। এফবিআই রিচার্ড ম্যাককয়কে ডি বি কুপার হিসেবে শনাক্ত করেনি। প্রথম ঘটনার বিমানবালাদের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গেও তাঁর চেহারার মিল নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
এ ছাড়া আরও বহু ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁদের পরিচিত কোনো ব্যক্তি হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থের মালিক হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এসব দাবি কুপারের পরিচয় নিশ্চিত করার মতো প্রমাণে পরিণত হয়নি।
এফবিআইয়ের কাছে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য কেবল সন্দেহ বা সম্ভাব্য মিল যথেষ্ট ছিল না। তদন্তকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য যাচাই করলেও এমন প্রমাণ পাননি, যা দিয়ে ছিনতাইকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
ডি বি কুপারের ফেলে যাওয়া কালো টাই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফরেনসিক প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ায় টাইয়ের ওপর লেগে থাকা ক্ষুদ্র কণাগুলোও পরীক্ষার আওতায় আসে।
এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, টাইটি থেকে ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে টাইয়ের ওপর পাওয়া অতি ক্ষুদ্র কণা নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করা হয়। এ ধরনের কণা কোনো ব্যক্তির কাজের পরিবেশ, সংস্পর্শে আসা উপাদান কিংবা চলাফেরার বিষয়ে সম্ভাব্য সূত্র দিতে পারে।
টাইয়ের কণায় কিছু বিরল ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখান থেকে কুপার কোনো বিশেষায়িত শিল্পকারখানা বা উৎপাদন পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, সে ধরনের অনুমানও সামনে এসেছে। কিন্তু কোনো কণার উপস্থিতি একাই নির্দিষ্ট পেশা কিংবা ব্যক্তির পরিচয় প্রমাণ করে না।
ফলে টাইয়ের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা তদন্তের জন্য আগ্রহের বিষয় হলেও তা ডি বি কুপারের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি।
দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তদন্ত চালানোর পর ২০১৬ সালের ৮ জুলাই এফবিআই জানায়, ডি বি কুপার মামলার জন্য বরাদ্দ তদন্ত-সম্পদ অন্য অগ্রাধিকারমূলক কাজে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এফবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের সময় সংস্থাটি সম্ভাব্য সূত্রগুলো পর্যালোচনা করেছে, বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়েছে, সাক্ষীদের বক্তব্য নিয়েছে এবং প্রাপ্ত আলামত পরীক্ষা করেছে। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও ছিনতাইকারীর পরিচয় নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মামলাটির সব আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বা রহস্যের আনুষ্ঠানিক সমাধান হয়ে গেছে। এফবিআই জানিয়েছিল, মামলার প্রমাণ ঐতিহাসিক নথি হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। ভবিষ্যতে প্যারাস্যুট বা ছিনতাইয়ের মুক্তিপণের অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কোনো বাস্তব আলামত পাওয়া গেলে তা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া যেতে পারে।
অর্থাৎ, সক্রিয় তদন্তে বরাদ্দ সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হলেও ডি বি কুপারের পরিচয় ও পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
ডি বি কুপারের ঘটনা শুধু একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের কাহিনি নয়; এটি এমন এক তদন্তের ইতিহাস, যেখানে অপরাধীকে শনাক্ত করার জন্য কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করেও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
তিনি কি পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন? নাকি ঝুঁকিপূর্ণ ঝাঁপের পর দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন? কলাম্বিয়া নদীর তীরে পাওয়া অর্থ তাঁর শেষ যাত্রার সূত্র, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা ছিল? তাঁর টাইয়ে লেগে থাকা কণাগুলো কি ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্যের সন্ধান দিতে পারবে?
এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। কুপারের মৃত্যুর পক্ষে যেমন চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তেমনি তাঁর বেঁচে থাকার পক্ষেও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
১৯৭১ সালের সেই রাতে তিনি ঠিক কীভাবে উড়োজাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কোথায় নেমেছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসবের অনেক কিছুই তদন্তের নথি থেকে জানা যায়। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় এবং শেষ পরিণতি অজানাই রয়ে গেছে।
ডি বি কুপার তাই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত রহস্য। তাঁর ঘটনা নিয়ে বহু তত্ত্ব, সন্দেহভাজন ও গল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের কাছে এখনো অনুপস্থিত সেই একটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, যা রহস্যের অবসান ঘটাতে পারে।
তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং হিস্ট্রি।