
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। একের পর এক হামলার মধ্যেই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনালে আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে বিমানবন্দরটিকে ‘অনিরাপদ’ উল্লেখ করে সেটি ব্যবহার না করার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দেশটির বিমান চলাচল, তেল স্থাপনা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত শনিবার সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে সাতটি হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, হুতিরা দেশটির পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে গোষ্ঠীটি।
এদিকে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তসংলগ্ন ইয়েমেনের তাইজ শহর ঘিরে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। শহরটিতে আটকে পড়া প্রায় আট লাখ মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল–মালিকি জানিয়েছেন, রোববার সকালে রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে।
সৌদি সামরিক জোট আরও জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দিকে ছোড়া অতিরিক্ত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলার দাবি করে আসছে হুতিরা। তাদের ঘোষিত লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইন ও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলার ফলে সৌদি আরবের জ্বালানি সরবরাহ, বিমান চলাচল এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পর রোববার দুটি টার্মিনালে আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ শনিবার রাতে জানায়, রোববার থেকে ২ নম্বর টার্মিনালে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ নম্বর টার্মিনাল।
এর আগে ১০ অক্টোবর বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিমানবন্দরে কার্যক্রম পুনরায় চালু হলেও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বিমানবন্দরটিকে ‘অনিরাপদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় বিমান সংস্থা, বিমানবন্দরের কর্মী এবং যাত্রীদের এটি ব্যবহার না করার জন্য সতর্ক করেছেন তিনি।
ইয়াহিয়া সারি আরও বলেছেন, বিমানবন্দরটি ব্যবহার করার কারণে কোনো ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় সৌদি কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিমানবন্দরকে ঘিরে হুতিদের হুমকি অব্যাহত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলেও নতুন হামলার আশঙ্কা যাত্রী ও বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
খালিজ টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার সৌদি আরবের সাতটি স্থানে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। তাদের ঘোষিত লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে কিং খালিদ, কিং ফাহাদ ও নাজরান বিমানবন্দর; ইয়ানবুতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা; রাবিগ তেল শোধনাগার; একটি তেল পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশন এবং খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি।
হুতিদের দাবি, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশনেও তারা সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। তবে এসব স্থাপনায় হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং তেল সরবরাহে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, শনিবার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে পড়েছে। এ ছাড়া জেদ্দার আল–নুজহা, তায়েফের ওয়াদি জলিল এবং রাবিগের মাস্তুরাহ সেন্টারেও ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
তবে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটি সৌদি কর্তৃপক্ষের এই অভিযোগকে ‘বড় মিথ্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এর আগে হুতিরা জানিয়েছিল, পবিত্র শহর দুটিকে তারা লক্ষ্যবস্তু করবে না।
ফলে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবর এবং পবিত্র শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াই তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহর ঘিরে সংঘর্ষ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার তাইজ শহরের কাছে জাবাল সাবর পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হয়েছেন হুতি যোদ্ধারা। শহরটি ঘিরে অবরোধ জোরদার করার পাশাপাশি সৌদি আরব–সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের সঙ্গে প্রধান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তাইজের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে শহরটির নিয়ন্ত্রণ সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সেখানে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, তাইজ শহরে আটকে পড়া প্রায় আট লাখ মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চলমান সংঘর্ষ ও যোগাযোগব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে এসব মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, শনিবার হুতিদের লক্ষ্য করে তারা সাত শতাধিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীটির তিন শতাধিক যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে তারা। তবে হতাহতের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি এবং ইয়েমেনের তাইজে তীব্র লড়াই—দুই ঘটনাই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানাচ্ছে, অন্যদিকে হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি করছে।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আংশিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বিমান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিমানবন্দর ব্যবহার না করার বিষয়ে হুতিদের সতর্কবার্তা নতুন করে নিরাপত্তাঝুঁকির প্রশ্ন সামনে এনেছে।
একই সময়ে তাইজে আট লাখ মানুষের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা সংঘাতের আরেকটি গুরুতর দিক তুলে ধরেছে। সামরিক তৎপরতা ও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, জরুরি সহায়তা সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
(রয়টার্স ও আল–জাজিরা)