
বিবিসি
কোনো কাজ, অভ্যাস কিংবা জীবনযাপনের কোনো একটি দিককে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা—বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রবণতা বোঝাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ম্যাক্সিং’ (Maxxing) শব্দটি। বিশেষ করে জেনারেশন জেড (জেন-জি) এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শব্দটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। আর এ কারণেই ‘ম্যাক্সিং’কে ২০২৬ সালের বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে নির্বাচিত করেছে অভিধান ও ভাষাবিষয়ক ওয়েবসাইট ডিকশনারি ডটকম।
ডিকশনারি ডটকমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি এসেছে ‘ম্যাক্সিমাইজিং’ (Maximizing) শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে। এর অর্থ কোনো কিছুকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা কোনো কাজের মাধ্যমে যতটা সম্ভব ভালো ফল অর্জনের চেষ্টা করা। শব্দটি স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহার করা যায়। আবার কোনো শব্দের শেষে যুক্ত করেও নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর ধারণা প্রকাশ করা যায়।
উদাহরণ হিসেবে, কেউ নিজের ঘুমের মান উন্নত করতে নিয়মিত বিভিন্ন অভ্যাস অনুসরণ করলে সেটিকে বলা হচ্ছে ‘স্লিপম্যাক্সিং’ (Sleepmaxxing)। একইভাবে, বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নানা পদ্ধতি অনুসরণ করাকে বলা হচ্ছে ‘লুকসম্যাক্সিং’ (Looksmaxxing)। অর্থাৎ জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাফল্য, দক্ষতা কিংবা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের প্রচেষ্টাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করছে ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি।
ডিকশনারি মিডিয়া গ্রুপের লেক্সিকোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক স্টিভ জনসন বলেন, ‘ম্যাক্সিং হলো এমন এক সংস্কৃতির ভাষাগত প্রকাশ, যা সবকিছু থেকে সর্বোচ্চটা আদায় করার ব্যাপারে ক্রমেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।’
ডিকশনারি ডটকমের গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল মাধ্যমে ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসের গড় ব্যবহারের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে ডিজিটাল মাধ্যমে শব্দটির ব্যবহার প্রায় ১৯ গুণ বেশি ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিজেদের চেহারা, ব্যক্তিত্ব, ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, কর্মদক্ষতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপন উন্নত করার প্রচেষ্টাকে বোঝাতে তাঁরা শব্দটির নানা রূপ ব্যবহার করছেন।
শব্দটির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এমন একটি সামাজিক প্রবণতা, যেখানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আরও ভালো করার চেষ্টা গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে চান, কেউ কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চান, আবার কেউ সামাজিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য কিংবা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। এসব প্রচেষ্টার সঙ্গে ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি যুক্ত হয়ে গেছে।
ডিকশনারি ডটকমের মতে, শব্দটির ব্যবহার এখন আর নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং জীবনের বিভিন্ন দিককে সর্বোত্তম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ধারণা প্রকাশে এটি একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে।
‘ম্যাক্সিং’ শব্দটির ব্যবহার বহু বছর ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘লুকসম্যাক্সিং’ (Looksmaxxing) প্রবণতা।
লুকসম্যাক্সিং বলতে নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য ও শারীরিক আকর্ষণীয়তা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করাকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে ত্বকের যত্ন নেওয়া, শরীরচর্চা করা, চুলের পরিচর্যা, পোশাক-পরিচ্ছদে পরিবর্তন আনা এবং শারীরিক গঠন উন্নত করার চেষ্টা। তবে কিছু অনলাইন গোষ্ঠীতে এই প্রবণতা চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং সৌন্দর্যের কঠোর মানদণ্ড অনুসরণের দিকেও গড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুকসম্যাক্সিং নিয়ে আলোচনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দটির মূল অংশ ‘ম্যাক্সিং’ও ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে একই কাঠামো ব্যবহার করে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের জন্য নতুন নতুন শব্দ তৈরি হতে থাকে।
এখন কেউ নিজের ব্যক্তিত্ব উন্নত করার প্রচেষ্টাকে ‘পারসোনালিটিম্যাক্সিং’ (Personalitymaxxing) বলছেন। ভালো ঘুমের জন্য নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলাকে বলা হচ্ছে ‘স্লিপম্যাক্সিং’। এমনকি খাদ্যাভ্যাসে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে ‘প্রোটিনম্যাক্সিং’ (Proteinmaxxing) বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে।
এভাবে কোনো একটি বিষয়কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ধারণা প্রকাশে ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি তরুণদের অনলাইন ভাষার একটি পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে।
‘ম্যাক্সিং’ শব্দটির ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গেমিং, বিনোদন এবং প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট আলোচনায় শব্দটির নানা রূপ ব্যবহৃত হয়েছে।
জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি রোল-প্লেয়িং গেম ডানজন্স অ্যান্ড ড্রাগনস (Dungeons & Dragons)-এর খেলোয়াড়েরা বহু বছর ধরে ‘মিন-ম্যাক্সিং’ (Min-maxing) কৌশল ব্যবহার করে আসছেন। এ কৌশলে খেলোয়াড়েরা নিজেদের চরিত্রের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য বা সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা করেন। এর জন্য কখনো কখনো অন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের উন্নতিকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১৯৪০-এর দশকে গেম থিওরির আলোচনাতেও শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। আবার মার্কিন সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা উইল স্মিথের ১৯৯০-এর দশকের একটি গানের ‘ম্যাক্সিন অ্যান্ড রিল্যাক্সিন’ কথাটিও শব্দটির পুরোনো ব্যবহার স্মরণ করিয়ে দেয়।
তবে অতীতে শব্দটির ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এটি অনেক বেশি বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে অনলাইন সংস্কৃতিতে কোনো কিছু নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চেষ্টা চালানো কিংবা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে জীবনের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়ার প্রবণতা বোঝাতে শব্দটি জনপ্রিয় হয়েছে।
ডিকশনারি ডটকমের অভিধান সংকলন বিভাগের পরিচালক স্টিভ জনসন বলেন, প্রতিবছরের বর্ষসেরা শব্দ নির্বাচনের সময় তাঁদের কর্মীরা ইন্টারনেটে শব্দ খোঁজার প্রবণতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে শব্দের ব্যবহার বিশ্লেষণ করেন। এরপর তাঁরা বিবেচনা করেন, কোন শব্দটি ওই বছরের উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে ভালো প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
জনসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ‘ম্যাক্সিং’ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ শব্দটি মানুষের জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মানুষ সকালের নাশতায় প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘প্রোটিনম্যাক্সিং’, কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সময় টোকেনের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ‘টোকেনম্যাক্সিং’ (Tokenmaxxing) এবং ছুটির দিনে আরামদায়ক পরিবেশে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে ‘কোজিম্যাক্সিং’ (Cozymaxxing) করছে।
এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, ‘ম্যাক্সিং’ এখন শুধু ব্যক্তিগত সৌন্দর্য বা শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ধারণায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম এবং কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রেও শব্দটির প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের বর্ষসেরা শব্দ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ডিকশনারি ডটকম আরও কয়েকটি শব্দ বিবেচনা করেছিল। এর মধ্যে ছিল ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’ (Affordability), অর্থাৎ কোনো পণ্য বা সেবার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য; ‘ডেটা সেন্টার’ (Data Center); ‘জার্নি’ (Journey), অর্থাৎ কোনো যাত্রা বা অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা; এবং ‘আঙ্কেল’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘ইইউএনসি’ (Unc)।
তবে শেষ পর্যন্ত ‘ম্যাক্সিং’কেই বিজয়ী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এর অন্যতম কারণ, শব্দটি একই সঙ্গে তরুণদের অনলাইন ভাষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা এবং আধুনিক জীবনে সর্বোচ্চ ফল অর্জনের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে।
‘ম্যাক্সিং’-এর জনপ্রিয়তা বর্তমান সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতার প্রতিফলন। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে মানুষ এখন নিজেদের জীবনযাপন, অভ্যাস এবং অর্জনকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার আরও বেশি সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত উন্নতি, উৎপাদনশীলতা এবং শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কোনো একটি ক্ষেত্রে নিজেকে উন্নত করার প্রচেষ্টাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করার জন্য ‘ম্যাক্সিং’-এর মতো শব্দ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা সব সময় বাস্তবসম্মত বা প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে সৌন্দর্য, শারীরিক গঠন কিংবা কর্মদক্ষতা নিয়ে অতিরিক্ত চাপ কখনো কখনো ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি বাড়াতে পারে।
তবু ভাষার পরিবর্তন ও নতুন শব্দের জনপ্রিয়তা বোঝার ক্ষেত্রে ‘ম্যাক্সিং’ একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এটি দেখায়, কীভাবে ইন্টারনেট সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা একটি শব্দ ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডিকশনারি ডটকমের ২০২৬ সালের বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে ‘ম্যাক্সিং’-এর নির্বাচন তাই শুধু একটি নতুন শব্দের জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি নয়; বরং বর্তমান সময়ের মানুষের জীবনযাপন, ব্যক্তিগত উন্নতির আকাঙ্ক্ষা এবং অনলাইন সংস্কৃতির পরিবর্তনশীল ভাষারও প্রতিফলন।