
বোর্নিও দ্বীপে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন হাজারো মানুষ, বাসে ৫–১০ মিনিট অক্সিজেন নেওয়ার সুযোগ; আগস্ট থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ
ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। আগুন থেকে ছড়িয়ে পড়া ঘন ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নানা সমস্যায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির লক্ষণ না থাকায় ধোঁয়ায় আক্রান্ত মানুষের সাময়িক স্বস্তি দিতে চালু করা হয়েছে বিশেষ ‘অক্সিজেন বাস’। এসব বাসে অক্সিজেন সিলিন্ডারের পাশাপাশি চিকিৎসাকর্মীরাও থাকছেন। বাসে উঠে নলের সাহায্যে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট অক্সিজেন নিতে পারছেন মানুষ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্নিও দ্বীপের সেন্ট্রাল কালিমানতান প্রদেশের পালাংকা রায়া শহরে এসব বাস চালু করা হয়েছে। দাবানলের ধোঁয়ায় বায়ুদূষণ তীব্র আকার ধারণ করায় শহরের বাসিন্দাদের শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাসগুলোর বাইরের রং নীল ও সাদার মিশ্রণ। ভেতরে রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা। সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসাকর্মীরা, যাঁরা অক্সিজেন নিতে আসা মানুষকে সহায়তা করছেন।
তবে অক্সিজেন বাসের এই উদ্যোগ ধোঁয়াজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা। দাবানল নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ুদূষণ কমানো না গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কঠিন।
পালাংকা রায়ায় সরেজমিনে দেখা গেছে, দাবানলের ধোঁয়ায় অসুস্থ বোধ করা মানুষ অক্সিজেন নিতে বাসে আসছেন। বাসের ভেতরে চিকিৎসাকর্মীদের তত্ত্বাবধানে তাঁরা নলের মাধ্যমে অক্সিজেন নিচ্ছেন।
বাসে দায়িত্ব পালন করা এক চিকিৎসাকর্মী জানান, সেখানে আসা বেশির ভাগ মানুষের কাশি হচ্ছে অথবা শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। ধোঁয়ার কারণে তাঁদের শ্বাসতন্ত্রে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অক্সিজেন নিতে আসা ৪৪ বছর বয়সী ওকতাভিনা রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি প্রকৃতির কারণে সৃষ্টি হওয়া একটি দুর্যোগ। আমাদের করার তেমন কিছুই নেই।’
তাঁর কথায়, দাবানলের মতো দুর্যোগ সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ধোঁয়ার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে মানুষকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে হয়।
দাবানলের ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে শুধু আগুনের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষই নয়, দূরবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বাতাসের গতিপথ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ধোঁয়া বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেশটির সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপে প্রায়ই এ ধরনের আগুন দেখা যায়। তবে এবারের দাবানলকে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
দাবানলের প্রভাবে শুধু ইন্দোনেশিয়াই নয়, প্রতিবেশী মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের আকাশেও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব এলাকার আকাশ ধোঁয়ার কারণে কমলা রঙের হয়ে উঠেছে।
দাবানলের ধোঁয়া দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসে অবস্থান করলে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের ঝুঁকি বেশি থাকে। ধোঁয়ার মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম কণা ও অন্যান্য দূষক শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে কাশি, চোখে জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বায়ুদূষণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। পালাংকা রায়ায় অক্সিজেন বাস চালুর উদ্যোগ সেই জরুরি প্রয়োজনেরই প্রতিফলন।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দাবানলের কারণে দেশটিতে শ্বাসতন্ত্রের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আগস্ট থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ।
এর মধ্যে সেন্ট্রাল কালিমানতান প্রদেশেই আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩১ হাজার। এই পরিসংখ্যান দাবানলের ধোঁয়ায় জনস্বাস্থ্য কতটা ঝুঁকির মুখে পড়েছে, তা তুলে ধরে।
তবে এই সময়ে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত সব মানুষের অসুস্থতার কারণ যে শুধু দাবানলের ধোঁয়া, তা পরিসংখ্যান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ধোঁয়ার প্রভাব মূল্যায়ন করতে রোগের ধরন, বায়ুদূষণের মাত্রা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণও বিবেচনায় নিতে হয়। তবু দাবানলের সময় শ্বাসতন্ত্রের রোগীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অক্সিজেন বাসে গিয়ে অক্সিজেন নেওয়ার সুযোগ আক্রান্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে পারে। তবে যাঁদের তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তাঁদের জন্য যথাযথ চিকিৎসা মূল্যায়ন ও হাসপাতালভিত্তিক সেবা প্রয়োজন হতে পারে।
দাবানলের ধোঁয়া থেকে মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার জন্য অক্সিজেন বাস চালু করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলার জন্য আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ুদূষণ কমানো জরুরি। আগুন জ্বলতে থাকলে নতুন করে ধোঁয়া তৈরি হবে এবং বাতাসে দূষণের মাত্রা বাড়তে পারে।
এ ধরনের দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার, ধোঁয়ার সংস্পর্শ কমানোর এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাইরে যেতে হলে ধোঁয়া থেকে সুরক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসকষ্ট বা অন্য গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়ার পালাংকা রায়ায় চালু হওয়া অক্সিজেন বাস দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার একটি উদ্যোগ। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য এবং প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, দাবানলটি শুধু স্থানীয় পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক বায়ুমান—দুই ক্ষেত্রেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।