
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার টোকিওতে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী একটি বন্ধুরাষ্ট্রের নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে পেরে তিনি আনন্দিত। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা উঠে এসেছে।
সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত তারেক রহমানের সরকারের রাষ্ট্র গঠন ও জাতীয় উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে জাপান দৃঢ়ভাবে সমর্থন করবে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপানের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
দুই নেতার বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতি জাপানের সমর্থন এবং নতুন সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মুক্ত, অবাধ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে জাপান। সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ তৈরিতে দেশটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, এই অবস্থান আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে বিশেষ সুযোগ এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের অংশীদারত্ব ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সানায়ে তাকাইচি জানান, দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি বিগ-বি’ নামে নতুন একটি কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামোয় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতে পারস্পরিক অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বড় ও তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশকে জাপানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের সংযোগকারী অবস্থান বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে বলে মনে করেন তাকাইচি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের বিষয়টি উঠে আসে। সানায়ে তাকাইচি জানান, তারেক রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপানের স্বীকৃতি এবং দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের কথা স্মরণ করেছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে জাপানের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তারেক রহমান। তিনি জাপানকে বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে জাপান যে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা করে আসছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তা স্বীকার করেছেন বলেও জানান তাকাইচি।
দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকনির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তাকাইচির বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের আওতায় সরকারি সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী জাপান।
বাংলাদেশ ও জাপানের এই শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে দুই দেশ ভবিষ্যতে সহযোগিতা আরও বাড়াতে চায়।