
‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে মন্তব্যের সমালোচনা; স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সরকার ও ইসিকে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, শুধু দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং আইজিপির দ্রুত দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে গাজীপুরে এনসিপির আয়োজনে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থাকলেও তাঁর বক্তব্যে ভিন্ন বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, সরকারের নির্দেশ পেলে ক্রসফায়ার চালানোর কথা বলা আইনের শাসনের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইজিপির অপসারণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সংস্কারের আহ্বান জানান।
এর আগে সোমবার রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, সরকারের অনুমতি পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গেও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির নেতাদের প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে না পারলে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও সতর্ক করেন, অতীতের মতো দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন পরিচালনার চেষ্টা হলে তাঁরা রাজপথে প্রতিবাদে নামবেন।
সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রশাসনে দলীয় লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা বাড়ছে। তাঁর দাবি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেই কারও বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। পাশাপাশি পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে ক্রসফায়ার নিয়ে এমন বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এসব পরিস্থিতির মধ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা।
সভায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পরিস্থিতির তুলনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও পোশাকশ্রমিকদের আয় বাড়ানোর বিষয়ে কেন সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
এ সময় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির প্রতি সমর্থন জানান তিনি।
এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশ্যে গাজীপুর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সভাটির আয়োজন করা হয়।
এতে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ, ঢাকা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেড়াইদেরচালায় জুলাই আন্দোলনে পঙ্গুত্ব বরণ করা মো. বাপ্পিকে দেখতে যান নাহিদ ইসলাম।
সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনে বহু মানুষের প্রাণহানি, অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্ব বরণের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আহত ব্যক্তিদের প্রতি সরকারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বা প্রশাসনিক জটিলতা যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। চিকিৎসাসেবায় অবহেলা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
আইজিপির বক্তব্য, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা—এই বিষয়গুলোতে নাহিদ ইসলামের মন্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি ও সরকারের দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।