
আইএসের অস্ত্র প্রশিক্ষণ মামলায় মার্কিন নারী দোষী
যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কাছ থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন হালিমা সালমান নামের এক মার্কিন নারী। মঙ্গলবার ঘোষিত এ রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাঁর সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া হালিমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন ২০১৭ সালে তাঁর বাবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিরিয়ায় যান। হালিমার দাবি, তিনি ভেবেছিলেন, তাঁরা তুরস্কে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু পরে তাঁদের বহনকারী গাড়ি সিরিয়ায় প্রবেশ করে এবং সেখানেই তাঁর জীবনের পরিস্থিতি বদলে যায়। হালিমার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা তাঁকে আইএসের এক যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে দেন।
মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশন পক্ষ হালিমার বিরুদ্ধে আইএসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং সংগঠনটির কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে। আদালতে উপস্থাপন করা হয় এমন একটি ভিডিও, যেখানে তাঁকে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে দেখা যায়। এ ছাড়া আইএসের পতাকার সঙ্গে তাঁর একটি ছবিও প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। স্বামীর কাছে পাঠানো কয়েকটি খুদে বার্তাও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
বিচার চলাকালে হালিমার আইনজীবীরা দাবি করেন, কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় গিয়ে তিনি গৃহযুদ্ধ ও চরমপন্থী স্বামীর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, স্বামীর নির্দেশ অমান্য করা তাঁর জন্য বিপজ্জনক ছিল এবং তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাননি। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় হালিমা বলেন, স্বামীর কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে হত্যার আশঙ্কা ছিল। ১৮ বছর বয়সে জোর করে বিয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেননি বলেও তিনি জানান।
হালিমা আরও দাবি করেন, বিয়ের পর একাধিকবার বিচ্ছেদের চেষ্টা করেছিলেন। দাম্পত্য জীবনের বেশির ভাগ সময় তাঁকে স্বামী ও শাশুড়ির জন্য ঘরের কাজ করতে হতো। ২০১৮ সালে বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর বাবা মারা যান। সিরিয়ায় সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একাধিকবার বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, শেষ দিকে বোমা হামলার কারণে তাঁদের রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছিল।
অন্যদিকে, প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি, হালিমা সিরিয়ায় নিজের ভূমিকা সম্পর্কে পুরো সত্য তুলে ধরেননি। তাঁর স্বাধীনতা ও কর্মকাণ্ডের পরিধি সম্পর্কে আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন। স্বামীর কাছে পাঠানো বার্তা এবং অস্ত্র হাতে থাকার ভিডিওকে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে হালিমার বক্তব্য, স্বামীর অনুরোধেই তিনি রাইফেলটি হাতে নিয়েছিলেন।
একপর্যায়ে অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে একটি ট্রাকে করে পালিয়ে যান হালিমা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পালানোর সময়ই তিনি স্বামীকে তাঁদের সম্পর্ক শেষ করার কথা জানান এবং এরপর আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। ২০১৯ সালে সিরিয়ার বাঘুজ এলাকায় আইএসবিরোধী বাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। পরে ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ফিরে এলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
রায় ঘোষণার পর হালিমা, তাঁর মা ও আইনজীবীদের আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। তাঁর আইনজীবীরা আদালতের কাছে রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেওয়ার আবেদন করার কথা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করার যথেষ্ট কারণ না থাকলে বিচারক এমন আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন। তবে এ ধরনের আবেদন সচরাচর মঞ্জুর হয় না।
উল্লেখ্য, আইএসকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৪ সালে সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তথাকথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। ২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের পতন ঘটে। তবে এরপরও দুই দেশে সংগঠনটির সদস্য ও গোপন তৎপরতা নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়ে গেছে।