
সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠকে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ, গুমের মামলার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গুমের অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে এবং এ ব্যবস্থার কাঠামো ও গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে কমিটি আলোচনা করছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে মতবিনিময় করে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। সভায় ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, মতবিনিময়ে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে একটি অভিন্ন দাবি উঠে এসেছে—ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কেউ গুমের শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে গুমের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যাঁরা গুমের শিকার হয়ে এখনো ফিরে আসেননি, তাঁদের পরিবারের জন্য সহায়তা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন করেছে এবং সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁরা চান না বাংলাদেশে আর কখনো অতীতের সেই পরিস্থিতি ফিরে আসুক। গুমের অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা এবং কারা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা বন্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশায় ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছেন। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আবেদন সরকার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে। যেসব বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, সেগুলো সংবিধানে এবং যেসব বিষয়ে আইন বা বিধি প্রণয়ন দরকার, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও তাহসিনা রুশদী সভায় তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা নির্যাতন এবং আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।
বৈঠকে উঠে আসা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গুম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। এসব দাবির বিষয়ে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা সংবিধান সংশোধন ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিরোধী দলের চলমান আন্দোলন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল রাস্তায় আন্দোলন করছে। তাদের দাবিগুলো নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে এলে কমিটি তাদের বক্তব্য শুনতে পারত। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী দল কমিটিতে এসে বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে রাজপথের আন্দোলনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করতেই হবে। তবে কী প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে, এর রূপরেখা কী হবে এবং কীভাবে ব্যবস্থা গড়ে তুললে তা বিতর্কিত হবে না—এসব বিষয় বিশেষ কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।
তিনি বলেন, কমিটি এ বিষয়ে বিভিন্ন বৈঠকে নানা ধরনের পরামর্শ পেয়েছে। সেসব পরামর্শ সমন্বয় করে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে আলোচনা করা হবে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিষয়ে কমিটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কমিটির আলোচনার পর এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপিত হলে সেখানেও বিতর্ক, পরামর্শ ও প্রস্তাব আসতে পারে। অর্থাৎ, ব্যবস্থাটির কাঠামো ও বাস্তবায়নপদ্ধতি চূড়ান্ত করার আগে আরও আলোচনা হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী সময়ে ওই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি হয়তো অসতর্কভাবে শব্দচয়ন করেছেন। তবে এ ধরনের শব্দচয়ন সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি সরকারের আট মাসে কোনো ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে একটি অভিযোগ রয়েছে এবং সরকার সেটি তদন্ত করেছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তাদেরও তদন্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে তাঁর ভাষ্য, এখন পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণসহ কোনো অভিযোগ দেয়নি।
বর্তমান বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মী অতীতে গুমের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি বৈঠকে উপস্থিত হননি।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির এ বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন।
বৈঠকে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা এবং দাবিগুলো সংবিধান সংশোধন, আইনগত সুরক্ষা, বিচারপ্রক্রিয়া ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত আলোচনায় তুলে ধরা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মতো ঘটনা ঠেকাতে সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।