
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যশস্য সরবরাহে বিঘ্ন এবং এল নিনোর প্রভাবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির আশঙ্কা, জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্যের কারণে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়বে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ২০২৭ সালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে একসঙ্গে একাধিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ধাক্কা লাগছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ বাড়ছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, পণ্যের বাজার একই সময়ে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় এবং বাণিজ্যে বাধার কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাস এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কৃষিতে সেচ, সার উৎপাদন ও খাদ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের বাজারেও পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে দাম আরও ৭ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্যশস্য সরবরাহে বিঘ্ন, এল নিনোর তীব্র প্রভাব এবং জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্যকে এ মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
যুদ্ধের কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ এবং বাজারমূল্যের ওপর পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এসব পরিস্থিতি একসঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য কেনার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে, তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেশি পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে এল নিনোর কথা উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, এল নিনোর প্রভাব তীব্র হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনকারীদের বন্যা, খরা ও অতিরিক্ত গরমের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। এতে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এল নিনোর প্রভাব মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপ শুধু যুদ্ধ বা জ্বালানির বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আবহাওয়াগত ঝুঁকিও তাতে ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয়েছে, ইরান ও ইউক্রেনের সংঘাত নতুন করে আরও তীব্র হবে না।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। যুদ্ধের বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা বাড়িয়েছে। এর জবাবে ইরান ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বাধাগ্রস্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট পণ্য পরিবহন করা হয়। এ পথে চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়ে। সার উৎপাদনে জ্বালানির প্রয়োজন হয়, আবার কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও পরিবহনেও জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। তাই জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যপণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এল নিনোর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী হলে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে কৃষ্ণসাগরে খাদ্যশস্যের ওপর হামলা বাড়লে কিংবা ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে গেলে বিশ্ববাজারে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এসব ঝুঁকি একই সময়ে বাস্তব হলে ২০২৭ সালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম মূল পূর্বাভাসের তুলনায় আরও ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর্যায়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য কেনার ব্যয় বাড়বে এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
তবে ১০৫ ডলারের পূর্বাভাসটি সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। এটি বিশ্বব্যাংকের মূল পূর্বাভাস নয়; বরং যুদ্ধ, আবহাওয়াগত বিপর্যয় ও সরবরাহের বিঘ্ন একসঙ্গে তীব্র হলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার একটি ঝুঁকিভিত্তিক হিসাব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। করোনা মহামারির সময় বাদ দিলে চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সরবরাহে এটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় পতন।
সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী তেলের ব্যবহারও কমার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর তেলের ব্যবহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। ব্যবহার কমার এই পূর্বাভাস না থাকলে তেলের দাম আরও বেশি বাড়তে পারত বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, তেলের ব্যবহার কমার এই পতন হবে ইতিহাসের তৃতীয় বৃহত্তম। এর চেয়ে বড় পতন দেখা গিয়েছিল করোনা মহামারি এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের সময়।
তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে যুদ্ধ ও পরিবহনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, উচ্চমূল্য ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে চাহিদা কমে গেলে তেলের ব্যবহারও হ্রাস পেতে পারে। ফলে বাজারে সরবরাহের সংকট এবং চাহিদার দুর্বলতা—দুই বিপরীতমুখী প্রবণতা একই সময়ে কাজ করতে পারে।
পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং ঋণের ভারে জর্জরিত নিম্ন আয়ের দেশগুলো। জ্বালানি, খাদ্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এসব দেশের সরকারি ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের সুরক্ষা দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে ঋণের বড় বোঝা নিয়ে ইতিমধ্যে সমস্যায় থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়াও জরুরি।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে ৮৭০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির এই সহায়তা সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের অংশ। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে এসব দেশের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তুলে ধরা হয়েছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ বাড়ে। প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করলে ভোক্তাদের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, খাদ্য ও জ্বালানির জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে পরিবারগুলোর অন্যান্য পণ্য ও সেবা কেনার সামর্থ্য কমে যেতে পারে। এতে বাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট, চলতি বছরের শেষ নাগাদ পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধ, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, সার ও খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর মতো আবহাওয়াগত ঝুঁকি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য নতুন চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংঘাতের তীব্রতা, জ্বালানির সরবরাহ, আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং খাদ্যশস্যের বাণিজ্য কতটা স্বাভাবিক থাকে, তার ওপর নির্ভর করবে এই মূল্যবৃদ্ধি কত দূর গড়ায়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।