মা-বাবা চান সন্তানকে মাছ, ডাল, ভাতের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সবজি খাওয়াতে। কিন্তু শিশুর পছন্দের তালিকায় থাকে—ডিম, ফ্রাইড চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিংবা চিপস, বিস্কুট।

সমস্যাটা শুধু শিশুর ‘জেদ’ নয়, কোন বয়সে কীভাবে সবজির সঙ্গে শিশুর পরিচয় করানো হচ্ছে, খাবার কীভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, বাবা-মা নিজেরা কী খাচ্ছেন—এসবের প্রভাব রয়েছে শিশুর খাদ্যাভ্যাসে।

বিজ্ঞাপন · inarticle_1

২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ৬ হাজার ৬৬৮ শিশুর ওপর গবেষণা করে দেখা হয়, ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী কত শিশু ২৪ ঘণ্টায় কোনো ফল বা সবজি খায়নি এবং এর সঙ্গে কোন কোন বিষয় সম্পর্কিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ শিশুর মধ্যে অন্তত চারজনের আগের দিনের খাবারে কোনো ফল বা সবজি ছিল না। আগের ২৪ ঘণ্টায় কোনো ফল বা সবজি না খাওয়াকে—‘জিরো ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রুট’ বা জেডভিএফ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

গবেষকেরা সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—ফল ও সবজিতে ফরমালিনের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকার শঙ্কা, তাজা ফল-সবজির তুলনামূলক বেশি দাম, প্রক্রিয়াজাত বা ফাস্টফুড ধরনের খাবারের সংস্পর্শে বেশি থাকা এবং বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস।

গবেষকদের মতে, মা-বাবার ছোট ছোট কিছু কৌশল ও অভ্যাসের পরিবর্তনই পারে শাক-সবজিকে শিশুর প্রিয় খাবারে পরিণত করতে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা থেকে পাওয়া কয়েকটি সহজ কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মায়ের বুকের দুধে প্রাকৃতিক চিনি থাকার কারণে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই মিষ্টি খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফলে শিশু যখন শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে, তখন যেকোনো শাক খাওয়ানো কঠিন হয়ে উঠে।

সবজি খাওয়ানোর কার্যকর কৌশল

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বায়োসাইকোলজির অধ্যাপক মারিয়ন হেথারিংটনের মতে, শিশুকে ছোটবেলা থেকে যত বেশি ধরনের সবজির সঙ্গে পরিচয় ও নিয়মিত খাওয়ানোর অভ্যাস করা যায়, ততই ভালো। শিশুর সবজির প্রতি আগ্রহ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর সময় হলো—প্রাক-বিদ্যালয় বয়স।

  • বারবার পরিচিত করা: কোনো খাবার গ্রহণ করার আগে শিশুদের অনেক সময় সেটির সঙ্গে বারবার পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন হয়। একটি খাবার পছন্দ করতে শিশুর ৫ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত চেষ্টার প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি গর্ভাবস্থায় মা কী খাচ্ছেন, তাও শিশুর ভবিষ্যতের খাবারের পছন্দ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

  • শুরুতেই সবজি পরিবেশন: খাবারের শুরুতেই সবজি দিন, যখন শিশু সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকে। অন্য আকর্ষণীয় বা ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতিযোগিতা না থাকলে তারা সহজেই সবজি খেয়ে নেয়। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে এ নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের নাশতায় সবজি দেওয়া হলে ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে তা খেয়েছে।

  • সঠিক শব্দ চয়ন: কোনো খাবার ‘স্বাস্থ্যকর’—শিশুকে এমনটা বলে বোঝানোর চেষ্টা করলে উল্টো ফল দিতে পারে। শিশুদের ‘স্বাস্থ্যকর’ খাবারের চেয়ে ‘মজার’ বা ‘সুস্বাদু’ হিসেবে বর্ণনা করলে সেটা বেশি কাজে দেয়।

  • পরিমাণ ও আকর্ষণ বাড়ানো: প্লেটে মূল খাবারের অনুপাত ঠিক রেখে সবজির পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। খাবারকে ফুল, প্রজাপতি, টেডি বিয়ারসহ নানা আকৃতিতে কেটে পরিবেশন করলে শিশুরা কৌতূহলী হয়। এক প্লেটে বিভিন্ন ধরনের সবজি নির্দিষ্ট পরিমাণে সাজিয়ে দিলে শিশুরা প্রায় ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেশি সবজি খেয়ে থাকে।

মা-বাবার খাবারের অভ্যাস সরাসরি অনুসরণ করে সন্তান। বাবা-মা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে সন্তানদেরও সেগুলো খাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। নিউজিল্যান্ডের স্কুলশিশুদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর, তারা কম কেক, চকলেট ও অন্যান্য ঝাল খাবার খায়। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন পরিবারের সবাইর একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে।

শিশু কী খাবে, তা শুধু খাবারের স্বাদ বা পুষ্টিগুণের ওপর নির্ভর করে না। খাবারের সঙ্গে তার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করলে উল্টো ফল হতে পারে। তার বদলে খাবার স্পর্শ করা, ঘ্রাণ নেওয়া বা নাস্তার বিভিন্ন আইটেম নিয়ে খেলার সুযোগ দিন। শিশুদের রান্না-বান্নায় অংশ নিতে উৎসাহিত করলে নতুন খাবারের প্রতি তাদের ভয় দূর হয়।

শিশু যে সবজি খেতে চায় না এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝোঁক বেশি হওয়ার জন্য তার পছন্দ বা জেদকে দায়ী করা যাবে না। বাড়ি, স্কুল, বন্ধু, বাজার, খাবারের দাম, ফাস্ট ফুডের সহজলভ্যতা, মায়ের সময় সংকট এবং বাজারে ভেজাল বা ফরমালিন মেশানো ফল-সবজি নিয়ে আতঙ্ক—সব মিলিয়ে শিশুর খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়।

২০১৯ সালে ঢাকার ১৪টি স্কুলে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা ফল ও সবজির তুলনায় ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া, মাংস, মিষ্টি ও কোমল পানীয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছে।

বাংলাদেশে শিশুর খাবারে সবজি ও ফলের ঘাটতি শুরু হয় খুব ছোট বয়সেই। গবেষকদের মতে, শিশুদের ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস বাড়াতে শুধু শিশুকে খাবার দেওয়াই যথেষ্ট নয়। মায়ের পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে বিভিন্ন কৌশলের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে পুষ্টি-সংক্রান্ত উদ্যোগ ও সচেতনতা কার্যক্রম নেওয়ার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।