রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে পরিচিত একটি সড়ক, ঐতিহাসিকও বটে! যে সড়কের সাথে জড়িয়ে আছে কত বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী , শিক্ষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের মানুষেরও আবেগ, ভাললাগা ,স্মৃতিকাতরতা।

গগন শিরীষের ছায়ায় মোড়ানো রূপকথার পথ: প্যারিস রোড

বিজ্ঞাপন · inarticle_1

পিচঢালা মসৃণ এক রাজপথ। তার একপাশে ক্লান্তিভুলানো তিন ফুট চওড়া চেনা ফুটপাত, আর অন্যপাশে চোখ জুড়ানো গোলাপ বাগান। দুই ধারের আকাশছোঁয়া গগন শিরীষ গাছগুলো যেন পরম মমতায় ও আদরে দুপাশ থেকে জড়িয়ে রেখেছে পুরো পথটিকে। গাছের ডালপালার ফাঁক গলে সড়কের বুকে আছড়ে পড়ে সোনালী রোদের ঝিলিক। আলো-ছায়ার এই লুকোচুরি খেলায় পথটি যেন নিছক কোনো সড়ক নয়, বরং জীবন্ত কোনো শিল্পকর্ম বা প্রতিমা! পূর্ব থেকে পশ্চিমে নাক বরাবর সোজা চলে যাওয়া এক কিলোমিটারের এই জাদুকরি পথটির নামই—প্যারিস রোড।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট থেকে শেরেবাংলা আবাসিক হল পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কটি দৈর্ঘ্যে খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও, এটি যেন হাজারো শিক্ষার্থীর আবেগের এক সুবিশাল ক্যানভাস। বর্তমান আর সাবেক শিক্ষার্থীদের বুকভরা স্মৃতি, ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব, জীবনের পাওয়া-না পাওয়া, কিংবা একাকিত্বের নিঃসঙ্গতা—যুগের পর যুগ ধরে কত শত জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এই পথ!

রোদ্দুর, বিকেল আর প্রেমের উপাখ্যানঃ

বিকেলের নরম সোনা রোদ, গায়ে মেখে থাকা হালকা হিমেল হাওয়া আর গাছের ডালে ডালে পাখির মধুর কাকলি—এই পরিবেশেই প্যারিস রোড ধরে হেঁটে চলেন তরুণ-তরুণীরা। কখনো তারা একা, কখনো প্রাণের টানে দল বেঁধে, আবার কখনো রিকশার টুংটাং শব্দে কিংবা সাইকেলের চাকায় কেটে যায় রাস্তাটি। প্রতিদিন এভাবে ছোট্ট এই পথটির বুকে রচিত হয় সুখ-দুঃখের গল্প, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের নতুন সব উপাখ্যান। আবার এই পথেই তো বিচ্ছেদ কিংবা সম্পর্কের সমাপ্তির দীর্ঘশ্বাসও জমতে দেখেছে গগন শিরীষের পাতাগুলো!

ঋতুতে ঋতুতে প্যারিস রোডের রূপবদলঃ

কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত অবধি—প্যারিস রোড যেন কভু ঘুমোয় না। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন চাদরে যখন চারপাশ ঢাকা পড়ে, তখন শত শত শিক্ষার্থী ছুটে আসেন এই রূপালী পথটায়। আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই বসা আড্ডার আসরে প্রাণ ফিরে পায় পুরো চত্বর। শুধু কি শিক্ষার্থীরা? প্রিয়জনের হাত ধরে একটু সুন্দর সময় কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে বাইরের কত মানুষই না ছুটে আসেন এখানে!

আর মধ্যরাতে এই রোডের বুকে যখন শিক্ষার্থীদের গলা ছেড়ে গাওয়া গান ভেসে বেড়ায়, তখন শীতের জমাট কুয়াশাও যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে সেই সুর। মনে হয়, আকাশের দিকে মাথা তুলে থাকা গগন শিরীষগুলোও বুঝি একটুখানি ঝুঁকে এসে শুনছে সেই তারুণ্যের গান!

বর্ষা এলে প্যারিস রোড যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। আকাশে মেঘের ডম্বরু বাজলেই শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন রাস্তায়—কখন নামবে বরষার প্রথম ফোঁটা! বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গেই নেচে-গেয়ে, হই-হুল্লোড় আর ছুটাছুটি করে নিজেদের ভিজিয়ে তবেই যেন তাদের তৃপ্তি।

ইতিহাস ও নামকরণের গল্পঃ

আজকের এই রূপময় প্যারিস রোডের নেপথ্যে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৬৬ সালের আগেও রাস্তাটি ছিল, কিন্তু তখন না ছিল এই গগন শিরীষ গাছগুলো, আর না ছিল ‘প্যারিস রোড’ নামটি। ১৯৬৬ সালে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মহান ব্রত নিয়ে তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু বিশেষ গাছের চারা নিয়ে আসেন। সেই গাছগুলো পরম যত্নে রোপণের দায়িত্ব দেওয়া হয় উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের কৃতি শিক্ষক অধ্যাপক ড. আলী মোহাম্মাদ ইউনুসকে। তাঁরই জাদুকরি ছোঁয়া আর পরিচর্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে মাথা তুলে দাঁড়ায় গগন শিরীষের সারি।

দিন যায়, গাছগুলো বড় হতে থাকে আর রাস্তাটি হয়ে ওঠে মোহনীয়। এরপর আসে ১৯৮০-র দশক। সেসময়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘রোড টু সোয়াদ’ কিংবা ‘রোড টু প্যারিস’-এর অনিন্দ্য সুন্দর রাস্তাগুলোর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় আমাদের এই ক্যাম্পাসের পথটি। চলচ্চিত্রের সেই রূপের ছায়াতেই কালক্রমে এ রাস্তার নাম হয়ে যায় সবার প্রিয়—প্যারিস রোড।

প্যারিস রোড কেবল ইট-পাথর বা পিচের তৈরি কোনো পথ নয়; এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বুক চিরে বয়ে চলা এক আবেগের নদী, যেখানে মিশে আছে তারুণ্যের চিরন্তন স্রোত।