ঢাকা

নির্বাচন নিরপেক্ষ রাখতে ইসিকে শক্তিশালী ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান

-

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গতকাল বুধবার ১২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত করেছে। সংলাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইসিকে নিরপেক্ষ ও শক্ত ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে কতটা কার্যকরভাবে ইসি এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তা নিয়ে কিছু দলের মধ্যে সংশয়ও রয়েছে।

সংলাপের পরিপ্রেক্ষিত

নির্বাচন ভবনে দুই পর্বে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সকালে সাতটি দল—জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি—সংলাপে অংশ নেন। বিকেলে বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, গণ অধিকার পরিষদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও রিপাবলিকান পার্টি অংশ নেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন সংলাপে বলেন, দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা মেনে ইসিকে এগোতে হবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তা অপরিহার্য

বিএনপির প্রস্তাব

বিএনপি ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সংলাপে অংশ নেয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন,

“একবার সাহস করে এই সিদ্ধান্ত নিলে, রিটার্নিং অফিসার ইসির লোকদের হবে। অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসারও ইসির ডেডিকেটেড লোকেরা হবে। এতে নির্বাচনে গুণগত পরিবর্তন আসবে।”

এছাড়া বিএনপির উপদেষ্টা মাহদী আমিন অনলাইনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ও এআই ব্যবহার রোধের জন্য কেন্দ্রীয় ও উপজেলা পর্যায়ে ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

জামায়াতের প্রস্তাব

জামায়াতে ইসলামী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা লটারির মাধ্যমে বদলির ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে। দলটি মনে করে, তফসিল ঘোষণার পর হঠাৎ বদলি করা হলে নির্বাচন প্রভাবিত হতে পারে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন,

“এক মাসের মধ্যে অনেক ডিসি বদলি হয়েছে। লটারির মাধ্যমে বদলি করলে প্রশ্ন ওঠবে না। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার, প্রবাসী ভোটের রেজিস্ট্রেশন ও নির্বাচনী আচরণবিধি সংক্রান্ত অন্যান্য ব্যবস্থার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।”

ইসির সক্ষমতা নিয়ে সংশয়

নতুন নিবন্ধন পাওয়া এনসিপি এ বিষয়ে ইসিকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নের সামর্থ্য ইসির আছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম মুসা। তিনি উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে বিএনপির প্রধান হওয়া বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ব্যবহার সংক্রান্ত বিধিমালা প্রয়োগে ইসির সক্ষমতা পরীক্ষিত হবে।

নির্বাচনী পরিবেশ ও মনিটরিং কমিটির প্রস্তাব

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি সংলাপে বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া ইসি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে একা ভালো নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে না। তাই তিনি ‘নির্বাচনী পরিবেশ মনিটরিং কমিটি’ গঠনের দাবি তুলেছেন।

সংলাপে উঠা অন্যান্য প্রস্তাবনা

  • প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে অন্তত পাঁচজন সেনাসদস্য মোতায়েন

  • আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়া

  • নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো রোধ

  • নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন

  • নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা

  • নির্বাচনী আইনবিধি সংস্কারে দলের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনা

  • ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার

জোটবদ্ধ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়েও সংলাপে পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছে। এনসিপি ও মাইনরিটি জনতা পার্টি জোটের প্রার্থীকে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচনের সমর্থন জানায়। অন্যদিকে গণসংহতি আন্দোলন, এনডিএম ও লেবার পার্টি মনে করে জোটের প্রতীকে নির্বাচন করাই সঠিক।

সংলাপের পরবর্তী ধাপ

ইসি সূত্র জানায়, ১৩ নভেম্বর থেকে সংলাপ শুরু হয়েছে। ৫৬টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৪৯টি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিএনপি ও বিএনপির তৃণমূল বাদে ৪৭টি দল অংশ নিয়েছে।
এছাড়া ইসিতে নিবন্ধিত জাপা, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, তরীকত ফেডারেশন এখনো সংলাপে ডাকা হয়নি। সংলাপ এই পর্যায়ে শেষ হয়েছে। কোনো দল নিবন্ধন পেলে পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।

নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো ইসিকে শক্ত ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে। সংলাপ থেকে উঠে এসেছে প্রশাসনিক পদক্ষেপ, ভোটকেন্দ্র নিরাপত্তা, অনলাইন প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতীকের ব্যবহারসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা। তবে ইসির সক্ষমতা, রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা ও নিবন্ধিত দলের সম্পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।





কমেন্ট বক্স