বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দলের ভেতরের ষড়যন্ত্র এবং নেতা-কর্মীদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। তিনি বলেছেন, দলের কিছু মানুষের কথা ও কাজের কারণে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এতে প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজগুলোও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আপনার ভালো কাজগুলো কিছু লোকের খারাপ কথায় ও কাজে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’ একই সঙ্গে তিনি তারেক রহমানকে দলের ভেতর-বাইরের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মির্জা আব্বাস। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তারেক রহমানকে সতর্ক থাকার পরামর্শ
আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে মির্জা আব্বাস বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা হতে পারে। এ কারণে দলীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে এই দলের বিরুদ্ধে। অনেক ষড়যন্ত্র হবে। মাননীয় নেতা (তারেক রহমান), আপনার বিরুদ্ধে (ষড়যন্ত্র) হবে। আপনি দয়া করে একটু সাবধান থাকবেন।’
তারেক রহমানকে উদারমনা নেতা হিসেবে উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, তাঁর এই উদারতার সুযোগ যাতে কেউ নিতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজনীতিতে সব সময় এবং সব ক্ষেত্রে উদার থাকা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দলের কিছু নেতা-কর্মী তারেক রহমানের সামনে এক ধরনের কথা বলেন, কিন্তু বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধরনের আচরণ করেন। এ ধরনের দ্বিমুখী আচরণ দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আপনার সমস্ত ভালো কাজগুলো কতগুলো খারাপ লোকের খারাপ কথায়, কাজে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটা একটু দয়া করে আপনি লক্ষ রাখবেন।’
‘দলের ভেতর থেকেও ষড়যন্ত্র হচ্ছে’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুধু বাইরে থেকে নয়, দলের ভেতর থেকেও হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যাঁরা তথ্য জানেন, তাঁদের তা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘নেতাকে ফাঁকি দেওয়া মানে দেশকে ফাঁকি দেওয়া।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের স্বার্থে যেকোনো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নেতৃত্বকে সঠিক তথ্য জানানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে নেতা-কর্মীদের বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, অল্প কয়েকজন নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডের দায় পুরো দলের ওপর পড়তে পারে।
তিনি বলেন, দু-একজন মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো বিএনপির বদনাম হতে পারে না। তাই প্রত্যেক নেতা-কর্মীকে নিজের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
মির্জা আব্বাস জানান, দলের জন্য ক্ষতিকর কোনো বিষয় তাঁর নজরে এলে তিনি তা তারেক রহমানকে জানাবেন। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আরও কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্যে দলের কোনো সহকর্মী কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করে মির্জা আব্বাস বলেন, দলকে ভালোবাসেন বলেই তিনি এসব কথা বলছেন। তাঁর ভাষায়, ‘দলটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। এই দলটা দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখবে।’
৪৮ বছরের পথচলার কথা স্মরণ
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও নানা প্রতিকূলতার কথাও তুলে ধরেন মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, ৪৮ বছর ধরে বিএনপি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে টিকে আছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়েছে। দলের বহু নেতা-কর্মীও বিভিন্ন সময় জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।
মির্জা আব্বাসের মতে, এত প্রতিকূলতার পরও বিএনপি টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও দলটি টিকে থাকবে।
এ সময় বিএনপিতেই নিজের রাজনৈতিক জীবনের শেষ করতে চান বলেও জানান তিনি। বয়স ও শারীরিক কারণে আগের মতো সক্রিয়ভাবে কাজ করা সম্ভব না হলেও তারেক রহমানের কাছ থেকে সরে যাওয়ার কোনো কারণ দেখেন না বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা।
‘প্রধানমন্ত্রীর মুখ যাতে কালিমালিপ্ত না হয়’
আলোচনা সভায় জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহও বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে বিএনপি ‘স্বর্ণের মতো পরীক্ষিত’ হয়েছে। একইভাবে তারেক রহমানও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ‘সোনার মানুষে’ পরিণত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহবুব উল্লাহ আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমান তাঁর জীবনের বাকি সময় দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবেন এবং বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার ভূমিকা রাখবেন।
একই সঙ্গে এমন কোনো কর্মকাণ্ড না করার জন্য বিএনপির নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি, যাতে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, দলের নেতা-কর্মীরা যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং অন্যদেরও অনিয়ম ও খারাপ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখেন, তাহলে কোনো শক্তিই বিএনপিকে পরাজিত করতে পারবে না।
‘আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্র করছে’
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান দলের নেতা-কর্মীদের আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কোথাও ‘ফ্যাসিস্টদের প্রেতাত্মা’ দেখা গেলে নেতা-কর্মীদের নিজের হাতে আইন তুলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানাতে হবে।
বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সমালোচনা করে আমান উল্লাহ আমান অভিযোগ করেন, যারা অতীতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে রাজনীতি করার সুযোগ ও কথা বলার অধিকার পেয়েছিল, তাদের কেউ কেউ এখন আন্দোলনের নামে কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করছে।
তবে তাঁর বক্তব্যে এসব অভিযোগের বিস্তারিত কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা হয়নি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে স্মরণ ও ভিডিও প্রদর্শন
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলের প্রয়াত নেতাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এরপর জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে নির্মিত একটি ভিডিওচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু।
সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ফরহাদ হালিম, ইসমাইল জবিউল্লাহ, যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।