ঢাকা

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের চাপেও কেন পিছু হটবে না

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক মাস ধরে থেমে থাকা সামরিক সংঘাত চলতি সপ্তাহে আবারও সীমিত আকারে শুরু হয়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যদিও সাম্প্রতিক হামলাগুলো আগের তুলনায় সীমিত ছিল, বিশ্লেষকদের আশঙ্কা—যেকোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল হিসাব-নিকাশ পরিস্থিতিকে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।

মার্কিন বাহিনী গত মঙ্গলবার ইরানে হামলা চালানোর পর জবাবে তেহরান জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান পাল্টা হামলা চালালে তাদের আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। কিন্তু তেহরান সেই হুমকি উপেক্ষা করে প্রতিক্রিয়া জানায়।

সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই একদিকে সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসতেও রাজি নয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক বিরোধ রয়ে গেছে।

সীমিত হামলা, কিন্তু বিপদের মাত্রা কমেনি

সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এতে বোঝা যায়—যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান, কোনো পক্ষই আপাতত সর্বাত্মক যুদ্ধে যেতে চায় না।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি সিএনএনকে বলেন, কোনো পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরতে চায় না। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের বাধা এবং তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ—দুই পক্ষের জন্যই ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ যুদ্ধের মাত্রা কম থাকলেও সংঘাতের মূল বিরোধগুলো সমাধান হয়নি। বরং সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক চাপ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য কোনো ভুল পদক্ষেপও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিতরিনোভিচও মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দুই পক্ষের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মূলত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। বেসামরিক মানুষ বা জ্বালানি অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে সংযত রয়েছে। এমনকি তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হুমকি সত্ত্বেও ইরান সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নতুন করে বড় হামলা শুরু করেনি।

তবে এই সংযম কত দিন বজায় থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ট্রাম্প আলোচনায় অনাগ্রহী, ইরানও পিছু হটছে না

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তিনি বলেছেন, ইরান কোনো চুক্তি করলেই যে যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের অর্থনীতির ওপর মার্কিন চাপ—দুই দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

কিন্তু ইরানের আচরণে এখন পর্যন্ত তেহরানকে চাপের কাছে নতি স্বীকারের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং মার্কিন হামলার পর দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরান বোঝাতে চাইছে যে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখেও তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রস্তুত।

আইসিজির বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির ভাষায়, দুই পক্ষের জন্যই বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। একদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর একসঙ্গে এত বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রণালি পার করে দেওয়ার ঘটনা এটিই সর্বোচ্চ বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কিন্তু তেহরান হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে রাজি নয়। ইরানের দৃষ্টিতে, এই প্রণালিতে মার্কিন সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তাদের ওপর আরও বড় কৌশলগত চাপ তৈরির অংশ।

ফলে হরমুজ এখন শুধু তেল পরিবহনের একটি নৌপথ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ময়দান হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রেও

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ব্যাপক হলেও যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব থেকে ওয়াশিংটনও মুক্ত নয়।

বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের কারণে মার্কিন বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে।

যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি বাজারেও স্পষ্ট। গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বেশ চড়া।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ দশমিক ১৪ ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই দাম ছিল ৩ দশমিক ১৯ ডলার।

অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি মার্কিন ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে গেছে। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য পণ্যের ব্যয়ও বাড়তে পারে—যা সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

কৌশলগত তেলের মজুতেও চাপ

যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত থেকে জরুরি ভিত্তিতে তেল বাজারে ছাড়ছে।

এর ফলে দেশটির জরুরি কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করছে। কারণ ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জ্বালানি সরবরাহ সংকট দেখা দিলে জরুরি মজুত থেকে তেল সরবরাহের সক্ষমতা আগের তুলনায় কম থাকবে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি। তেলের দাম কখন যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরবে, সে বিষয়েও তিনি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি।

বরং তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, সংঘাতের সমাপ্তি অনেকটাই ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

মার্কিন অস্ত্রের মজুতেও টান

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু অর্থনীতিতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি করছে।

সিএনএনের কাছে তথ্য দেওয়া একাধিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে। একই সঙ্গে তাদের ‘প্যাট্রিয়ট’ ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেকও ব্যবহৃত হয়েছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।

তবে এসব তথ্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, কিছু নির্দিষ্ট অস্ত্রের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি বিশ্বের অন্য অঞ্চলে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্যও ওয়াশিংটনকে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে হয়।

দীর্ঘ যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ

ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথকে মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের একটি অংশ দীর্ঘস্থায়ী অভিযান নিয়ে সতর্ক করেছেন।

প্রতিবেদনটির বরাতে বলা হয়, কয়েকজন সামরিক কমান্ডার মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সিএনএন ওই প্রতিবেদনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

তারপরও এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান যত দীর্ঘ হবে, ততই ওয়াশিংটনের সামনে সামরিক সম্পদ, অর্থ এবং কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইরানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও সংকটজনক

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধের আর্থিক চাপ থাকলেও ইরানের পরিস্থিতি আরও কঠিন। দেশটির অর্থনীতি আগে থেকেই দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও নানা সংকটে দুর্বল ছিল। যুদ্ধের কারণে সেই চাপ আরও বেড়েছে।

ইরান তেল বিক্রি করতে সমস্যায় পড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপ দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলছে।

ইরানের সরকারঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরানিয়ান লেবার নিউজ এজেন্সির (আইএলএনএ) হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই পর্যন্ত আগের ১২ মাসে ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ইরানের অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে তেহরানের সামনে একদিকে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের চাপ সামাল দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তবু কেন সংঘাত বাড়াতে পারে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আরাশ আজিজির মতে, ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সামনে আত্মসমর্পণেরও বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের নেতৃত্ব মনে করতে পারে, পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করলে বর্তমান সরকারের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়বে, ততই তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য পাল্টা প্রতিরোধ জোরদার করতে পারে।

এই জায়গাতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব। অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব মনে করতে পারে, চাপের কাছে নতি স্বীকার করাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।

ফলে দুই পক্ষের কৌশল পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠেছে।

‘পাল্টাজবাব দেওয়াকেই বেছে নিয়েছে তেহরান’

আইসিজির বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, মার্কিন হামলার পর ইরানের দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, তেহরান এখনো চাপের কাছে মাথা নত করার চেয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার পথকেই বেছে নিচ্ছে।

এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবে, ইরান তত বেশি হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতাকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিতরিনোভিচও মনে করেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুই পক্ষের কৌশলের মৌলিক পার্থক্য সামনে এনেছে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সরাসরি বড় আকারের সামরিক সংঘাত এড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ ও নিয়ন্ত্রিত সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে লড়াই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। বিপরীতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং সেখানে মার্কিন আধিপত্যের চেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল নিয়েছে।

সিতরিনোভিচের মতে, তেহরান তেলবাহী জাহাজের চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মার্কিন প্রচেষ্টাকেও তারা চ্যালেঞ্জ জানাবে।

ইরানের শর্ত কী

ইরান বারবার বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি গত জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে, তাহলে তেহরানও আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত।

মঙ্গলবার কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ওই সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে, তাহলে ইরানও দ্রুত একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে।

অর্থাৎ তেহরান আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চাপের মুখে একতরফাভাবে ছাড় দিতে রাজি নয়।

অন্যদিকে ট্রাম্পের অবস্থান হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী এবং আলোচনায় যাওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর কোনো চাপ নেই।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে দূরত্বই এখন সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার প্রধান বাধা।

যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমতেও চাপ

ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু জ্বালানি ও সামরিক ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্পের সামগ্রিক জনপ্রিয়তা কমেছে। ইরান সংকট মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ অসন্তুষ্ট বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

ইউম্যাস আমহার্স্টের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতির বিরোধিতা করছেন। একই জরিপে ট্রাম্পের সামগ্রিক জনসমর্থন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের অসন্তোষও বাড়তে পারে।

সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভুল হিসাব

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—দুই পক্ষই বড় যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সিতরিনোভিচের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত। তারপরও তারা একে অপরের ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে।

সমস্যা হলো, এই ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন। একটি ভুল সামরিক সিদ্ধান্ত, কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় হামলা, বেসামরিক হতাহতের ঘটনা কিংবা হরমুজ প্রণালিতে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দিতে পারে।

এ কারণে সাম্প্রতিক হামলা সীমিত হলেও সংঘাতকে নিরাপদ পর্যায়ে ফিরে গেছে বলে মনে করার সুযোগ নেই।

হরমুজে সমাধান ছাড়া অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা কম

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান অবস্থান এমন এক অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে কেউই সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না, আবার কেউই কৌশলগতভাবে পিছু হটতেও রাজি নয়।

যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে ইরানকে চাপে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে ইরান অর্থনৈতিক সংকট ও সামরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হরমুজকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে।

ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে কঠিন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

ফলে দুই পক্ষের এই বিপরীত অবস্থান যতদিন থাকবে, ততদিন সংঘাতের ঝুঁকিও থাকবে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ থেকে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয় তা হলো—ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চাপের মধ্যে থাকলেও এখনই যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে নতি স্বীকার করার পথে হাঁটছে না। বরং তেহরান মনে করছে, প্রতিরোধ বজায় রাখাই তাদের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনও মনে করছে, বর্তমান চাপ অব্যাহত রাখলে ইরান শেষ পর্যন্ত ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে। এই দুই বিপরীত হিসাবই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

আর সেই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি—যেখানে সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতকেই নয়, পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স