ঢাকা

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৯ হাজারের মৃত্যু, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হিসাব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৯২৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ৩০ হাজার ৫৯৫ জন। লেবাননের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর লেবাননে নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ৩৫৮ জন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৩৫৯ জন। অর্থাৎ গত কয়েক মাসের সংঘাতেই দেশটিতে মোট হতাহতের একটি বড় অংশ ঘটেছে।

হতাহতদের বড় অংশই লেবাননের নাগরিক। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মোট নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ৯৪ শতাংশ লেবাননের নাগরিক। বাকি ৬ শতাংশের মধ্যে সিরীয়, ফিলিস্তিনি এবং অন্যান্য দেশের নাগরিক রয়েছেন।

হতাহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মোট নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশ পুরুষ। অন্যদিকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ হতাহত ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের কম। এসব পরিসংখ্যান লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক প্রভাবের চিত্র তুলে ধরছে।

হামলায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যসেবা খাত

ইসরায়েলি হামলার প্রভাব শুধু হতাহত মানুষের সংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

লেবাননের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় অ্যাম্বুলেন্সকর্মীদের লক্ষ্য করে ১৮০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ১৩৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৪১৬ জন।

স্বাস্থ্যকর্মীদের হতাহত হওয়ার ফলে সংঘাতের সময়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা ও আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অবকাঠামোর ওপরও পড়েছে বড় ধরনের চাপ।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের ৪০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮৪টি অ্যাম্বুলেন্সও। এ ছাড়া ১৭টি হাসপাতাল হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর মধ্যে তিনটি হাসপাতালের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যেসব এলাকায় সংঘাত সবচেয়ে বেশি তীব্র, সেখানে আহত ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চল ও নাবতিয়েহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

লেবাননের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চল ও নাবতিয়েহ এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই দুই এলাকায় সংঘাতের তীব্রতা বেশি থাকায় হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে হামলা ও হতাহতের ঘটনা শুধু দক্ষিণাঞ্চল কিংবা নাবতিয়েহতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লেবাননের প্রায় সব প্রদেশেই কোনো না কোনো পর্যায়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ফলে সংঘাতের প্রভাব একটি নির্দিষ্ট সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আটকে না থেকে দেশের বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করার দাবি ইসরায়েলের

লেবাননে চালানো হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের বক্তব্য হলো, তারা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, হামলায় ব্যাপকসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।

বেসামরিক হতাহতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সংঘাতের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মার্চ থেকে নতুন করে সংঘাত তীব্র

লেবাননে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলা ও সংঘাতের প্রভাব শুরু হলেও চলতি বছরের মার্চ থেকে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুধু মার্চ থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পরই ৪ হাজার ৩৫৮ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৩৫৯ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ মোট হতাহতের একটি বড় অংশ অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাতেই ঘটেছে।

এর ফলে লেবাননের হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে আহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সসহ চিকিৎসা অবকাঠামোর একটি অংশ সরাসরি হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব লেবাননে

লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাত দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে মার্চে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা আরও জোরদার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে লেবানন আবারও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা বললেও এসব অভিযানের মানবিক মূল্য লেবাননের সাধারণ জনগণকেই বড় পরিসরে বহন করতে হচ্ছে।

হতাহতদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ হওয়ায় শিশু ও কিশোরদের ওপরও সংঘাতের ব্যাপক প্রভাব পড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বাড়ছে মানবিক সংকট

হাজারো মানুষের মৃত্যু ও কয়েক দশক হাজার মানুষের আহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি লেবাননের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করছে।

হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংঘাত চলাকালে জরুরি চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিয়মিত হামলা হচ্ছে, সেখানে চিকিৎসাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাও এই সংকটকে আরও গভীর করছে। কারণ যুদ্ধ বা হামলার সময় আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যখন চিকিৎসাকর্মীর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখনই তাদের একটি অংশ হতাহত হচ্ছেন।

সামনে আরও অনিশ্চয়তা

লেবাননের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান হামলায় দেশটির বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

৮ হাজার ৯২৫ জন নিহত ও ৩০ হাজার ৫৯৫ জন আহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসা অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি পরিস্থিতির মানবিক মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

ইসরায়েল হামলাগুলোকে হিজবুল্লাহবিরোধী সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে দেখালেও লেবাননের মাটিতে এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল ও নাবতিয়েহের মতো এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেশি হলেও দেশটির প্রায় সব প্রদেশেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

ফলে লেবাননে সংঘাত কমানোর পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো রক্ষার বিষয়টিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে দেশটির মানবিক ও চিকিৎসা পরিস্থিতি আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স