ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানে বিধ্বস্ত গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও কথিত ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার’ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের (এমইই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার পরিস্থিতি নিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি রামাল্লায় গিয়েছিলেন টনি ব্লেয়ার। সেখানে তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে তাদের পাঠ্যবই থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ বা ‘ফিলিস্তিন’ শব্দটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেছেন জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক।
গ্রিনস্টকের দাবি, ফিলিস্তিনের পাঠ্যক্রমে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দের পরিবর্তে ইসরায়েলিরা পশ্চিম তীরের জন্য যে নাম ব্যবহার করে—‘জুডিয়া ও সামারিয়া’—তার মধ্যে ‘সামারিয়া’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর সক্ষমতা প্রদর্শন এবং শান্তি পর্ষদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর অংশ হিসেবেই এমন দাবি তোলা হয়েছিল।
তবে টনি ব্লেয়ারের একজন মুখপাত্র এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, দাবিটি ‘পুরোপুরি অসত্য এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট’।
আব্বাসের সরাসরি প্রত্যাখ্যানের দাবি
১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ছিলেন জেরেমি গ্রিনস্টক। তিনি ‘ডেভিড হার্স্ট পডকাস্ট’-এ দেওয়া এক বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে টনি ব্লেয়ারের সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন।
গ্রিনস্টকের দাবি, শান্তি পর্ষদের হয়ে সম্প্রতি ব্লেয়ারকে রামাল্লায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠ্যক্রম থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দ বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
তিনি বলেন, এ তথ্য তিনি মন্ত্রী পর্যায়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের কাছ থেকে পেয়েছেন।
গ্রিনস্টকের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ওই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, পাঠ্যবই থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দ বাদ দেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রিনস্টক শান্তি পর্ষদের নীতি ও উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, একটি শান্তি উদ্যোগের অংশ হিসেবে কোনো পক্ষের শিক্ষাক্রম থেকে একটি দেশের বা জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি তোলাই বিস্ময়কর।
গ্রিনস্টক বলেন, ‘শান্তি পর্ষদ ফিলিস্তিনের শিক্ষাক্রম নিয়ে এমন দাবি তুলতে পেরেছে—এটি ভেবেই আমি বিস্মিত।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই পর্ষদ কোন নীতিতে কাজ করছে এবং ন্যায়বিচার, সততা ও সংকটটির ইতিহাস সম্পর্কে তাদের যথেষ্ট ধারণা আছে কি না।
অভিযোগ অস্বীকার ব্লেয়ারের মুখপাত্রের
গ্রিনস্টকের বক্তব্যের বিষয়ে টনি ব্লেয়ারের একজন মুখপাত্রের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
মুখপাত্র বলেন, ‘এটি পুরোপুরি অসত্য এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি কথা।’
ফলে টনি ব্লেয়ার আদৌ ফিলিস্তিনি পাঠ্যবই থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে এখন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত তাঁর নির্ভরযোগ্য সূত্রের কথা উল্লেখ করে অভিযোগটি করেছেন, অন্যদিকে ব্লেয়ারের পক্ষ থেকে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করা হয়েছে।
ইসরায়েল সফরের পর কায়রোতে বৈঠক
গাজা নিয়ে শান্তি পর্ষদের কার্যক্রমে টনি ব্লেয়ারের সাম্প্রতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত আগস্টের মাঝামাঝি তিনি ইসরায়েল সফর করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং গাজাবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলে ম্লাদেনভ।
ইসরায়েল সফরে তাঁরা দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও এর আগে নেতানিয়াহু গাজা নিয়ে ট্রাম্পের কথিত শান্তি পরিকল্পনার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ইসরায়েল সফরের পর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলটি কায়রো যায়। সেখানে তারা গাজার দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সদস্যদের সঙ্গেও বৈঠক করে।
এই ধারাবাহিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধের পরবর্তী প্রশাসন, পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শান্তি পর্ষদের তৎপরতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় ব্লেয়ারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জেরেমি গ্রিনস্টক মনে করেন, যুদ্ধোত্তর গাজা ব্যবস্থাপনায় টনি ব্লেয়ার যে ভূমিকা পালন করছেন, তা তাঁকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার মুখে ফেলতে পারে।
গ্রিনস্টকের মতে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্লেয়ারের অতীত ভূমিকা এবং ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কারণে তাঁকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে।
তিনি বলেন, উভয় পক্ষকে সমান মর্যাদা দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার মতো নিরপেক্ষ অবস্থানে ব্লেয়ার নেই। ইরাক যুদ্ধ এবং যুক্তরাজ্যের সরকারি ক্ষমতা ছাড়ার পর ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্লেয়ারের কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে অনেকেই পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে দেখবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রিনস্টকের মতে, এই কারণে শান্তি পর্ষদের কাজ করতে গিয়ে ব্লেয়ার এখন কঠিন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও তাঁকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হতে পারে।
‘অবাস্তব ও খামখেয়ালি কমিটি’
শান্তি পর্ষদের কাঠামো নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন গ্রিনস্টক। তিনি এটিকে একটি ‘অবাস্তব ও খামখেয়ালি কমিটি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তাঁর মতে, এমন একটি কাঠামো ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েল কিংবা আরব বিশ্বের ওপর মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারবে না। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেসব কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেগুলোর রাজনৈতিক ও নৈতিক ভার বহন করার মতো শক্ত ভিত্তি পর্ষদটির নেই বলে মনে করেন তিনি।
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে গ্রিনস্টক মূলত প্রশ্ন তুলেছেন—গাজা যুদ্ধের মতো দীর্ঘ ও জটিল একটি সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত এই কাঠামো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
ফিলিস্তিনের নাম মুছে ফেলার অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক
ফিলিস্তিনের পাঠ্যক্রম থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দ বাদ দেওয়ার অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ফিলিস্তিনি পরিচয়, ইতিহাস ও ভূখণ্ডের নাম নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিতর্ক চলছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসের বই ও জাদুঘরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দ এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের উল্লেখ সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি স্কুলগুলোর ৪৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের তৈরি পাঠ্যক্রম চালুর উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পর্যালোচনার জন্য একটি সংশোধিত পাঠ্যক্রম গোপনে ছড়িয়ে দেওয়ার তথ্যও মিডল ইস্ট আই পেয়েছে বলে জানিয়েছে।
লেবাননে পাঠ্যক্রম নিয়েও বিতর্ক
চলতি বছরের শুরুতে লেবাননে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত শিক্ষাক্রম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। ইসরায়েল ইতিমধ্যে সংস্থাটিকে নিষিদ্ধ করেছে।
লেবাননে ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত ষষ্ঠ শ্রেণির আঞ্চলিক ভূগোলের কিছু মানচিত্রে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দের পরিবর্তে ‘ওয়েস্ট ব্যাংক’ বা পশ্চিম তীর এবং ‘গাজা উপত্যকা’ লেখা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়।
ইউএনআরডব্লিউএর কর্মীদের সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে ইসরায়েল যে অভিযোগ তুলেছিল, ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাথরিন কোলোনার নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল সেই অভিযোগের সত্যতা পায়নি। তবে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা আরও জোরদার করতে তদন্ত দল ৫০টি সুপারিশ করেছিল।
ব্রিটিশ মিউজিয়াম নিয়েও অভিযোগ
ফিলিস্তিনের নাম ও ইসরায়েলি দখলদারত্বের উল্লেখ সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ব্রিটেনেও উঠেছে।
লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একটি প্রদর্শনী থেকে ‘ফিলিস্তিন’ এবং ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ শব্দ সরিয়ে ফেলার অভিযোগের তদন্ত দাবি করেছে ব্রিটিশ এমপিদের একটি সর্বদলীয় জোট।
মিডল ইস্ট আইয়ের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইসরায়েলপন্থী লবিস্টদের চাপের মুখে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এসব শব্দ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
ফলে ফিলিস্তিনের নাম, ইতিহাস ও দখলদারত্বের বর্ণনা কীভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও পাঠ্যক্রমে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের আহ্বান
সাক্ষাৎকারে জেরেমি গ্রিনস্টক যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকেও ইসরায়েল প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য বর্জনের দাবি জানানো সাবেক রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে গ্রিনস্টক অন্যতম। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য যদি আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে মৌলিক অবস্থানে অটল থাকার কথা বলে, তাহলে সেই নীতি সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যেভাবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে অবস্থান নেয়, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়েও যুক্তরাজ্যকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গ্রিনস্টক। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করা উচিত।
পশ্চিম তীর নিয়ে নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য নিয়েও মন্তব্য
গ্রিনস্টকের মতে, পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের কর্তৃত্বের অধীনে আনা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষা। তাঁর দাবি, নেতানিয়াহু তাঁর বাবা বেনজিয়ন নেতানিয়াহুর ইচ্ছা পূরণ করতে চান।
গ্রিনস্টক মনে করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলাকে নেতানিয়াহু সেই লক্ষ্য পূরণের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। পশ্চিম তীরকে ‘জুডিয়া ও সামারিয়া’ নামে অভিহিত করার বিষয়টিও এই রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত বলে তিনি মনে করেন।
তবে এসব বক্তব্য গ্রিনস্টকের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন।
‘সামরিক শক্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়’
গ্রিনস্টক ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ইসরায়েল একটি গণতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সমাজ হিসেবে যে অর্জন করেছে, তা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু ফিলিস্তিন ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির সামরিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার নীতি কতটা কার্যকর হতে পারে।
ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি দেশটির নাগরিকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আপস ও সমঝোতা অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও গ্রিনস্টকের সমালোচনা
সাক্ষাৎকারে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়েও কথা বলেন গ্রিনস্টক। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের মূল্যায়নে ঘাটতি ছিল।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা, পারস্য উপসাগরের অপর পাড়ে হামলা এবং ড্রোন যুদ্ধের মতো সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলো ওয়াশিংটন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ফলে শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, তেল পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানে হামলার সময় নির্ধারণ নিয়েও গ্রিনস্টক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্ক থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি সরানোর বিষয়টিও হামলার সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
‘মক্কা চুক্তি’কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থার সংকেত বললেন
সম্প্রতি রিয়াদে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’কে গ্রিনস্টক মার্কিন শক্তির ওপর আঞ্চলিক দেশগুলোর আস্থা কমে যাওয়ার একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।
তাঁর মতে, এই চুক্তি নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতার বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর একটি স্পষ্ট বার্তা। তবে এর মাধ্যমে স্বনির্ভরতার সব প্রয়োজন মিটবে না এবং ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার দুটি কারণও উল্লেখ করেছেন গ্রিনস্টক। প্রথমত, আরব দেশগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের স্বার্থের তুলনায় ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ নীতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—এমন ধারণা আরব মিত্রদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কবার্তা
ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার এবং ইরাকে গঠিত কোয়ালিশন প্রোভিশনাল অথরিটির প্রতিনিধি পল ব্রেমারের সঙ্গে কাজ করার সরাসরি অভিজ্ঞতা রয়েছে গ্রিনস্টকের।
তিনি জানান, ২০০২ সালের শরতে ইরাক ইস্যুতে জাতিসংঘকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য মার্কিন প্রশাসনকে রাজি করাতে টনি ব্লেয়ার ও ব্রিটিশ দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলও এতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানান তিনি।
তবে ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরুর সময় ব্লেয়ার অভিযান কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেন গ্রিনস্টক। তাঁর মতে, গণবিধ্বংসী অস্ত্রের স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন ব্লেয়ার। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সেই অনুরোধকে কালক্ষেপণ হিসেবে দেখেছিল।
গ্রিনস্টকের মূল্যায়ন, ইরাক যুদ্ধের মতো বড় সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্রিটেনের প্রভাব ছিল সীমিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড সামরিক শক্তির ওপর বেশি নির্ভর করেছিলেন বলে তিনি মনে করেন। কলিন পাওয়েলের বাস্তবতাভিত্তিক পরামর্শও তখন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামরিক শক্তির বদলে ‘বোঝানোর সক্ষমতা’ প্রয়োজন
গ্রিনস্টকের সামগ্রিক বক্তব্যে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি। তাঁর মতে, কসোভো যুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র যেসব যুদ্ধে জড়িয়েছে, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জিত হয়নি।
আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইরানকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
গ্রিনস্টকের ভাষায়, বিশ্ব এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ক্ষমতা একক কোনো রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি এবং অন্যদের বোঝানোর সক্ষমতা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তাঁর মতে, শক্তি প্রয়োগের তুলনায় কূটনৈতিকভাবে বোঝাতে পারার সক্ষমতা এখন অনেক বেশি কার্যকর। বিশ্ব আরও উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্রীয় সরকারের বাইরে বিভিন্ন পক্ষও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখছে। ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় কমে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ফিলিস্তিনি পাঠ্যবই থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দ বাদ দেওয়ার অভিযোগ সত্য কি না, তা নিয়ে টনি ব্লেয়ার ও তাঁর সমালোচকদের মধ্যে সরাসরি মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তবে এই অভিযোগের মধ্য দিয়ে গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, ফিলিস্তিনি পরিচয় ও ইতিহাসের উপস্থাপন এবং শান্তি পর্ষদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আর জেরেমি গ্রিনস্টকের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করে ইরাক যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব—সবকিছুকে একই আলোচনার মধ্যে নিয়ে এসেছে। তাঁর মূল বার্তা হলো, সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়; শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে।