ঢাকা

সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র-সামরিক সরঞ্জাম বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সৌদি আরবের কাছে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের বোমা, গাইডেন্স কিট ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে গত শুক্রবার এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যতের আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় রিয়াদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনী ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য অংশীদারদের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সৌদি আরবের সমন্বয়ও উন্নত হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের মতো ন্যাটোর বাইরের একটি প্রধান মিত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই অস্ত্র বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সময়েই সৌদি আরবের কাছে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির এই অনুমোদন দেওয়া হলো। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে সৌদি আরবও আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এই সময়ে ইরানি বাহিনী এবং তেহরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সৌদি আরব। ফলে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় রিয়াদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন অস্ত্র সরবরাহের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করা। এর ফলে দেশটি সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় বাড়তি সক্ষমতা পাবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন

সৌদি আরবের কাছে প্রস্তাবিত এই সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রক্রিয়াটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, বড় ধরনের বিদেশি অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে অবহিত করা হয় এবং আইনপ্রণেতাদের আপত্তি বা অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে পররাষ্ট্র দপ্তর অনুমোদন দিলেও সৌদি আরবের কাছে এই সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের আগে আরও একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে।

প্রস্তাবিত চুক্তিতে বোমা ও গাইডেন্স কিটের পাশাপাশি অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও রয়েছে। এসব সরঞ্জাম সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির বিদ্যমান সামরিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে সৌদি আরবকে ন্যাটোর বাইরের একটি ‘প্রধান মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন রিয়াদের নিরাপত্তাকে নিজেদের বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার কারণে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন মিত্র দেশও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে রিয়াদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত করছে।

ইরান-সংঘাতের প্রভাব

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং পাল্টা হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংঘাতের প্রভাব শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের পাশাপাশি ইয়েমেনে সক্রিয় হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র ব্যবহার করে দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের জন্য উন্নত বোমা, গাইডেন্স কিট এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি অস্ত্র বিক্রির চুক্তি হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবেও দেখছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন-সৌদি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিভিন্ন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নতুন সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনী এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য অংশীদারদের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে দেশটির সমন্বয় উন্নত করা সম্ভব হবে।

অর্থাৎ, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে রিয়াদের সামরিক সমন্বয় আরও ঘনিষ্ঠ করাও এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সামনে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত

এখন প্রস্তাবিত ৫০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুমোদনের পর আইনপ্রণেতাদের সামনে বিষয়টি এসেছে। কংগ্রেসের প্রক্রিয়া শেষ হলে চুক্তিটি বাস্তবায়নের পথ আরও পরিষ্কার হবে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-সংঘাত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের কাছে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলেরও প্রতিফলন। ওয়াশিংটনের বিবৃতি অনুযায়ী, এর লক্ষ্য সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা সমন্বয় আরও কার্যকর করা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স